রাজশাহীতে গ্যাস সংকট ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে রান্নার কাজে বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব বাড়ছে কাঠের খড়ির। মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা খড়ির আড়তে এখন জমে উঠেছে ব্যবসা। ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটি তৈরির দোকান থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের ঘরোয়া রান্নায়ও ব্যবহার বাড়ছে খড়ির ব্যবহার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহীতে কাঠের খড়ির চাহিদা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটি তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি হিসেবে কাঠের খড়ি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শীত বা গ্রীষ্মÑ বছরজুড়েই এ রুটির দোকানে খড়ির চাহিদা অপরিবর্তিত থাকে। বর্তমানে রাজধানীসহ অন্যান্য বড় শহরের মতো রাজশাহীতেও জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব স্পষ্ট। এর সঙ্গে সম্প্রতি গ্যাসের তীব্র সংকট, সিলিন্ডারের আকাশছোঁয়া দাম ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এ শহরের মানুষের দৈনন্দিন রান্নার কাজেও খড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। মহানগরীসংলগ্ন কাশিয়াডাঙ্গা, আমচত্বর, কাটাখালী, নওহাটাসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে এখন সারি সারি কাঠের খড়ির আড়ত দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মহানগরীতে অর্ধশতাধিক আড়তে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকার খড়ি বিক্রি হয়। সে হিসাবে শুধু দৈনিক প্রায় পাঁচ লাখ টাকার খড়ি বিক্রি হচ্ছে, যার মাসিক আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকায়।
কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার আড়তদার আমজাদ হোসেন জানান, তার আড়তে প্রতিদিন ২৫-৩০ মণ খড়ি বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য ১০ হাজার টাকার ওপরে। তিনি বলেন, বর্তমানে গ্যাসের অতিরিক্ত দামের কারণে খড়ির ক্রেতা অনেক বেড়েছে। আগে যারা শুধু এলপিজি বা বিকল্প জ্বালানিতে রান্না করতেন, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন অনেকেই এখন খরচ বাঁচাতে রান্নার কাজে খড়ি ব্যবহার করছেন।’
বালিয়াডাঙ্গা এলাকার আরেক আড়তদার মাহবুবুল আলম বলেন, ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটির ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কাঠের খড়ির চাহিদাও অনেক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ গৃহস্থালির বাড়তি চাপ। তিনি জানান, আমগাছ ছাড়াও শিশু, মেহগনি, আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছের খড়ির চাহিদা বাজারে সবচেয়ে বেশি। এসব কাঠ দিয়ে বিভিন্ন হোটেল ও কালাই রুটির দোকান ছাড়াও সাধারণ ক্রেতারাও প্রয়োজন অনুযায়ী বান্ডিল বা মণ হিসেবে খড়ি কিনছেন। সব মিলিয়ে খড়ি ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি বেশ জমজমাট। খড়ির ওপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেক ছোট ব্যবসায়ী। কোর্ট ভবনের সামনে প্রবীণ নারী খাইরুন নেছা দীর্ঘকাল ধরে কালাই রুটি বিক্রি করছেন। তার দোকানেরও রান্নার প্রধান জ্বালানি কাঠের খড়ি। তিনি জানান, প্রতি মণ খড়ি ৬০০ টাকা দরে কিনে তিনি কালাই রুটি তৈরি করেন। তার মতে, গ্যাসের চুলায় আসল স্বাদের রুটি তৈরি করা সম্ভব নয়, তাই ঐতিহ্য বজায় রাখতে কাঠের খড়িই ভরসা।
বাজারে এ বাড়তি চাহিদা একদিকে যেমন আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় নতুন গতি এনেছে, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি ব্যয় সামলাতে সাধারণ মানুষের কঠিন বাস্তবতার চিত্রও ফুটিয়ে তুলছে। ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটির চুলা থেকে শুরু করে নি¤œ আয়ের মানুষের রান্নাঘরÑ সবখানেই কাঠের খড়ির ব্যবহার এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
কাশিয়াডাঙ্গা বাজারের খড়ি কিনতে আসা গৃহিণী রোকেয়া বলেন, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি মাসে সিলিন্ডার কেনা কঠিন হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়েই খড়ি কিনে রান্নার কাজ সারছি। গ্যাসের তুলনায় খড়িতে খরচ অনেক কম হলেও ধোঁয়া ও রান্নার ঝামেলা একটু বেশি। তারপরেও সংসার চালাতে এখন বিকল্প হিসেবে এ খড়িই মূল ভরসা।
