বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জলজ জীববৈচিত্র্য গবেষণায় নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। সুন্দরবনের নদী ও খালে পাওয়া পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলজ প্রাণীর জিনগত বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় নতুন তথ্য যোগ করবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
‘সুন্দরবনের জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক ১৬ মাসব্যাপী গবেষণায় এ সাফল্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সরকারের সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। সম্প্রতি খুলনায় এক অনুষ্ঠানে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষক দলের প্রধান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক জানান, পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গবেষণার ফলাফল বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের পর সরকারি প্রক্রিয়ায় এসব তথ্য ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের ৬৫টি নদী ও খালে জরিপ চালান গবেষকরা। পাশাপাশি সুন্দরবনের ভেতরে প্রায় ৪২৪ কিলোমিটার এলাকায় নৌপথে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শ্যামনগর, কয়রা, মোংলা ও শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকেও নমুনা ও তথ্য নেওয়া হয়। গবেষণায় সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর প্রজাতি শনাক্তকরণ, জিনগত বৈচিত্র্য, প্রজনন মৌসুম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষকরা ৮৩টি মাছের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমার জন্য নতুনভাবে নথিবদ্ধ পাঁচ প্রজাতির মাছ এবং দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান পান। এসব প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স আগে আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের ডেটাবেজে ছিল না বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় নতুনভাবে নথিবদ্ধ পাঁচ প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে বড় আইশ পারশে, ফোঁটা বাটা, বার্মিজ এক ঠোঁটা, কুলি বেলে বা চ্যাপ্টা মাথা বেলে এবং সবুজ ফোঁটা বেলে। এ ছাড়া মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি পোকা নামে দুই প্রজাতির চিংড়ির ডিএনএ সিকোয়েন্সও আন্তর্জাতিক ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ডিএনএ বারকোডিংয়ের মাধ্যমে কোনো প্রাণীর জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার প্রজাতি শনাক্ত করা যায়। এ গবেষণায় বাহ্যিক গঠন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আণবিক বা জিনগত বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকের রেফারেন্স সিকোয়েন্সের সঙ্গে গবেষণায় পাওয়া সিকোয়েন্সের মিল ছিল ৯৮ দশমিক ১৯ থেকে ১০০ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এসব তথ্য আন্তর্জাতিক ডেটাবেজে যুক্ত হলে সুন্দরবনের জলজ প্রাণী শনাক্তকরণ ও ভবিষ্যৎ গবেষণা আরও সহজ হবে। গবেষণায় সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ—শরণখোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও চাঁদপাইয়ের জলজ সম্পদের বৈচিত্র্য মূল্যায়ন করা হয়। এতে শরণখোলা রেঞ্জে সর্বাধিক ১৬৪ প্রজাতির জলজ প্রাণীর বৈচিত্র্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে নতুন জরিপে ২৫১ প্রজাতির মাছ এবং ৫১ প্রজাতির খোলসযুক্ত জলজ প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দরবনে মোট ৩৮২ প্রজাতির সাদা মাছ এবং ৮৮ প্রজাতির খোলসযুক্ত জলজ প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এ তালিকায় চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস ও স্কুইডের মতো প্রাণী রয়েছে।
এর আগে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সুন্দরবনের মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর ডিএনএ বারকোডিং নিয়ে কাজ করেন। সেই গবেষণার মাধ্যমে সুন্দরবনের ১৪১ প্রজাতির মাছের ডিএনএ সিকোয়েন্স আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষক জানিয়েছেন।
গবেষণায় সুন্দরবনের জলজ সম্পদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অনিয়ন্ত্রিত ও অতিরিক্ত মাছ আহরণ, পোনা ধরা এবং নদী-খালে বিষ প্রয়োগের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে ভেটকি, পোয়া ও পাঙাশের মতো বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলজ সম্পদ সংরক্ষণে গবেষকরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ আহরণের সীমা নির্ধারণ, ক্ষতিকর জাল ও বিষ প্রয়োগ বন্ধ করা, প্রজননের উপযোগী খালকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা।
প্রতিবেদনে খোদিয়াখালী, আঠারোবেকি, আরমাল ও কাগাবোগা খালকে সংরক্ষিত খাল হিসেবে ঘোষণার বিষয়টিও বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ গবেষণার ফলাফল সুন্দরবনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী জলজ সম্পদ সংরক্ষণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর জিনগত তথ্য সংরক্ষণ শুধু প্রজাতি শনাক্তকরণেই নয়, ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, অবৈধ আহরণ শনাক্তকরণ এবং বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে গবেষণার পাশাপাশি কার্যকর সংরক্ষণব্যবস্থা ও টেকসই মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
The post আন্তর্জাতিক জিন ব্যাংকে যুক্ত হচ্ছে সুন্দরবনের ৭ জলজ প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স appeared first on ভোরের চেতনা.
