রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ। জাহাজের পতাকা, নিবন্ধন, বিমা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নথি যাচাই করে রাশিয়ার কথিত ‘ছায়া নৌবহরের’ ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসব জাহাজ তল্লাশি ও আটকের আইনি বৈধতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (ইউএনসিএলওএস) কাজে লাগিয়ে সন্দেহভাজন রুশ তেলবাহী জাহাজ পরিদর্শনে তৎপর হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। এর লক্ষ্য নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রুশ তেল পরিবহনকে আরও ব্যয়বহুল ও জটিল করে তোলা।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটির জ্বালানি খাতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পশ্চিমা দেশগুলো। এরপর নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অস্পষ্ট মালিকানা, প্রশ্নবিদ্ধ নিবন্ধন এবং প্রচলিত বিমাব্যবস্থার বাইরে চলাচলকারী জাহাজের ব্যবহার বেড়েছে। এসব জাহাজের বহরই ‘ছায়া নৌবহর’ নামে পরিচিত।
জাহাজের পরিচয় গোপন, ভুয়া পতাকা ব্যবহার, শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা এবং সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে পণ্যের উৎস আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে এই বহরের বিরুদ্ধে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো জাহাজের জাতীয়তা বা পতাকার বৈধতা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে যুদ্ধজাহাজ সেটি পরিদর্শন করতে পারে। জাহাজটি রাষ্ট্রহীন হওয়ার সন্দেহও এ ধরনের পরিদর্শনের ভিত্তি হতে পারে।
তবে শুধু নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকার কারণে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো জাহাজ আটক বা জব্দ করার স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি হয় না।
ডেনমার্কের আলবর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা সিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমুদ্র আইন প্রয়োগ এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা দুটি আলাদা বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন নিজে থেকে অন্য রাষ্ট্রের পণ্য রপ্তানি বন্ধ করার সাধারণ ক্ষমতা দেয় না।
১৩ অক্টোবর ভারত মহাসাগরে ‘ডিএফ পিক’ নামের একটি ট্যাংকার আটক করে ফ্রান্স। এর আগে ‘কালিনিনগ্রাদ’ নামে পরিচিত জাহাজটি বেনিনের পতাকায় চলছিল। পতাকার বৈধতা নিয়ে সন্দেহ এবং অবৈধ জ্বালানি পরিবহনের সম্ভাবনা যাচাই করতে জাহাজটিকে রিইউনিয়ন দ্বীপের দিকে নেওয়া হয়।
রাশিয়া এ পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ রাশিয়ার ছায়া নৌবহরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর রাশিয়াসংশ্লিষ্ট অন্তত পঞ্চম ট্যাংকার আটক করেছে ফ্রান্স। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের সহায়তায় উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়ার মালিকানাধীন ‘বেলা-১’ জাহাজ আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি, ভেনেজুয়েলীয় ও রুশ তেল পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল।
রাশিয়ার বাল্টিক অঞ্চলের বন্দর থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ডেনমার্ক ও সুইডেনের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে জাহাজের নিবন্ধন, বিমা, নিরাপত্তা সনদ এবং পরিবেশগত মান যাচাই জোরদার হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকায় এসব পদক্ষেপের আইনি সীমা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনগত এখতিয়ার এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের বিধান বিবেচনা করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ফলে রুশ তেল পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজ পরিচালনাকারী, ক্রেতা ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হবে।
তবে কয়েকটি জাহাজ আটক করলেই রাশিয়ার তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর প্রভাব নির্ভর করবে পশ্চিমা দেশগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ, বিকল্প পরিবহনপথ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার ওপর।
সব মিলিয়ে, রুশ তেল পরিবহন নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনকে কাজে লাগিয়ে চাপ বাড়াচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় আইনসম্মত হস্তক্ষেপের সীমারেখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
The post রুশ তেলবাহী ‘ছায়া নৌবহরে’ পশ্চিমাদের অভিযান, সমুদ্র আইন ঘিরে নতুন উত্তেজনা appeared first on ভোরের চেতনা.
