সাতক্ষীরার প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা এবার পরিণত হয়েছে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে। মেলায় দোকান বরাদ্দ, দৈনিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে।
মেলার সঙ্গে নড়াইলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের বড় ছেলে হাসান শিকদারের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অথচ সাতক্ষীরা পৌরসভার মালিকানাধীন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব পায়নি পৌরসভা। ফলে মেলার ইজারা, অর্থ আদায় ও আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেলায় দোকানের শ্রেণিভেদে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এর বাইরে বিদ্যুৎ বিল বাবদ দৈনিক ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইট বাবদ ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া দোকান স্থাপনের জন্য ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
মেলায় স্টল নেওয়া জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার বলেন, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার টাকা, ডেকোরেশনের জন্য ৯ হাজার টাকা এবং ইট বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি লাইটের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। শৌচাগার ব্যবহারে প্রতিবার ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মেলার আচার-চাটনির দোকানি আব্দুস সামাদ। তিনি বলেন, তাঁবুর জন্য ২০ হাজার টাকা এবং ডেকোরেশনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মোট ৩০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে, যার মধ্যে পাঁচটি লাইটের জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিতে হয়।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া এসব তথ্যে মেলায় দোকান পরিচালনার উচ্চ ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের ভিত্তিতে মেলা থেকে দৈনিক গড়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। এই অর্থ আদায় করছেন নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের বড় ছেলে হাসান শিকদার।
মেলার ইজারা ও হাসান শিকদারের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, আমরা নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলেকে গুড়পুকুরের মেলার ইজারা দিইনি। আমরা খুলনার একজনকে ইজারা দিয়েছি। মেলায় বিভিন্ন স্টল বসানোর জন্য যারা এসেছে, তারা ওই ব্যক্তির সঙ্গে এসেছে। তবে মানিক শিকদারের ছেলে মেলার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য বা নথিপত্র নেই।
মেলার ইজারার মোট ডাক কত টাকা ছিল, জানতে চাইলে আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, গুড়পুকুরের মেলা দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে মেলার ইজারার মোট ডাক কত টাকা ছিল, তা আমি বলতে পারব না।
অন্যদিকে, মেলার পরিচালনা ও এ পর্যন্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান শিকদার বলেন, ওটা আমি জানি না ভাই, খরচ খরচা বাদ দিয়ে যা থাকবে, তাই। মেলার সময়সীমা, ব্যয় ও প্রশাসনকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবার মেলা এক মাস থাকে। তবে এবার দেশের পরিস্থিতির কারণে ২০ দিন করা হয়েছে। কোনো রকমে খরচটা উঠছে। সবাই মিলে ঝুঁকি নিয়ে সাতক্ষীরার মেলাটা করছি। এটা একজনের নয়, সবার। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার দলীয় কোনো পদ নেই। আমি ব্যবসায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নই।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলেও পৌরসভা কোনো রাজস্ব পায়নি বলে জানা গেছে।
সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বলেন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পৌরসভার মালিকানাধীন জায়গা। এ জায়গা বৃক্ষমেলা, স্থানীয় মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজনের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে গুড়পুকুরের মেলাও এ জায়গায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ মেলা থেকে এখন পর্যন্ত পৌরসভা কোনো ধরনের রাজস্ব আদায় করেনি বা পায়নি। অপরদিকে, ২০ দিনব্যাপী আয়োজন শেষে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলা। তবে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনা খুলে সরিয়ে নিতে আয়োজকদের কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ।
তিনি বলেন, মেলার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে না। স্থাপনা খুলে সরিয়ে নিতে আয়োজকেরা সময় চেয়েছেন। তাই তাঁদের ধীরে ধীরে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, মেলা থেকে জেলা প্রশাসন কত টাকা ইজারা পেয়েছে, কিংবা কোনো অর্থ পেয়েছে কি না, তা জানতে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজের সঙ্গে পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
