যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের বিক্ষোভকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা। ফ্রান্সের আন্দোলনকে অভিবাসন, সীমান্তনীতি ও পশ্চিমা সভ্যতার সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে তারা মার্কিন ভোটারদের সতর্ক করছেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের মুসলিম রাজনীতিকদের নাম ও পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য এবং তার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার তথ্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মজুরি ও পেনশন নিয়ে অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ পদ্ধতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। পরে দেশটির অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সিজিটি আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বাড়ানো ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি তোলে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক অসন্তোষও আন্দোলনে যুক্ত হয়।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে কয়েকটি শহরে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঐতিহাসিক একটি নগর ভবনে আগুন দেওয়া এবং প্রায় এক হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার রাতে ফ্রান্সের কয়েকটি শহর ও প্যারিসের কিছু এলাকায় কারফিউ জারি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, একসময়ের মহান ফ্রান্সকে অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টরা লুটপাট করে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী ঝুকির মুখে রয়েছে, তা বুঝতে ফ্রান্সের পরিস্থিতির দিকে তাকানো উচিত।
ট্রাম্প আরও বলেন, ফ্রান্সে যা ঘটছে, বিরোধীরা যুক্তরাষ্ট্রেও তা ঘটাতে চায়। তার দাবি, এমন পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে হতে দেওয়া হবে না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোর সমালোচনা করে ট্রাম্প অভিবাসন নীতির প্রসঙ্গ তোলেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, প্যারিস শিগগিরই মুসলিম শহরে পরিণত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বন্ধ করলেও মাখোঁ তা করেননি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, অভিবাসীরা ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ফ্রান্সের নেতাদের দ্রুত সীমান্ত বন্ধ করার আহ্বানও জানান তিনি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফ্রান্সের লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক নগর ভবনে আগুন লাগার একটি ভিডিও শেয়ার করে দেশটিতে সহিংসতার জন্য উদারপন্থীদের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, পশ্চিমা উদারপন্থীরা অভিবাসীদের আত্মীকরণ ও সামাজিক সামঞ্জস্যের মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, উন্মুক্ত সীমান্তনীতির কারণে ফ্রান্স বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক ডেমোক্র্যাটরাও একই পথে এগোচ্ছেন। সিনেটর এরিক স্মিটও ফ্রান্সের পরিস্থিতির জন্য বামপন্থীদের দায়ী করেন।
তবে ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতেও তরুণেরা শিক্ষায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, আবাসন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
রিপাবলিকান নেতারা ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও সীমান্তনীতির সঙ্গে যুক্ত করে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জোরদার করতে চাইছেন। ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির সভাপতি জর্দান বারদেলাও সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী চরমপন্থা ও শহরতলির অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠীর ভূমিকার কথা বলেছেন। এর আগে ট্রাম্প ও ভ্যান্স দলটির নেতা মেরিন লে পেনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
কানসাসের নির্বাচনী সমাবেশে ডেমোক্র্যাটদের আক্রমণ করতে গিয়ে মুসলিম রাজনীতিকদের নাম ও পরিচয় নিয়েও বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ, কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইবকে আক্রমণ করেন। এ সময় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যনামও অপ্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনায় আনেন তিনি।
ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের ‘আবদুল মোহাম্মদ এল-সাইয়েদের দল’ বলে উল্লেখ করেন। এল-সাইয়েদের নামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রার্থীকে ‘মোহাম্মদ এল-সাইয়েদ’ বলে সম্বোধন করার সিদ্ধান্তটি তার জন্য দারুণ কৌশল ছিল। এল-সাইয়েদ এভাবে নাম উল্লেখ করায় অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, নিজের ইচ্ছায় ওই নামে ডেকেছেন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাকে খুশি যে নামে ডাকতে পারেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, এল-সাইয়েদের মধ্যনামও মোহাম্মদ। ওই অঞ্চলের কাউকে ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকলে নাম ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬৫ শতাংশ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পের এসব মন্তব্যে মুসলিম পরিচয় ও নামকে বিদ্রূপের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। নির্বাচনী প্রচারে বিরোধীদের নীতির সমালোচনার পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আলোচনায় আনার কারণে তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও তার প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের যৌথ জরিপে তার প্রতি সমর্থনের হার ৩৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন। এ ধারণা পোষণকারীদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকও রয়েছেন ৩৪ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ ধরনের ধারণা পোষণকারীর হার ১২ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর তাদের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সাল থেকে পরিচালিত এ ধারার জরিপে কোনো প্রেসিডেন্টের আমলে আর্থিক অবস্থার অবনতির কথা বলা মানুষের এটিই সর্বোচ্চ হার।
এ ছাড়া ৬৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ট্রাম্প আন্তরিক নন। সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার প্রচেষ্টা নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যে এক ফেডারেল বিচারক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সাময়িক বাধা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশটির অর্থনীতি নিয়েও হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘তেমন ভালো নয়’ অথবা ‘খারাপ’ বলে মূল্যায়ন করেছেন। অর্থনীতি পরিচালনায় ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন ৩৭ শতাংশ, যেখানে রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা রয়েছে ২৮ শতাংশের।
নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে ট্রাম্প আন্তরিক নন বলে মনে করেন ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা। ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় এ হার পাচ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট ৬৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের মধ্যে ৩৭ শতাংশ নিজেদের রিপাবলিকান সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
জরিপের পাশাপাশি নির্বাচনী লড়াইয়ের কিছু পরিস্থিতিও রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী তিন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দীর্ঘ আট বছর পর কানসাসে নির্বাচনী সমাবেশ করেন ট্রাম্প। অঙ্গরাজ্যটি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
১৯৩২ সালের পর কানসাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর নির্বাচিত হননি। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার প্রেক্ষাপটে এবার অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের আধিপত্য ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিনেটর রজার মার্শালের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন ট্রাম্প। মার্শাল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের কাছ থেকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হ্যামিলটন একজন মেথডিস্ট গির্জার জ্যেষ্ঠ যাজক।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারের তৃতীয় প্রান্তিকে হ্যামিলটন প্রায় এক কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছেন। বিপরীতে মার্শালের সংগ্রহ আট লাখ ডলার। কানসাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের এক কিংবা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বাধা বাড়তে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ভেটো ক্ষমতা ও নির্বাহী কর্তৃত্বের কারণে প্রেসিডেন্টের হাতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাল্টাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।
রয়টার্সের জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ দলটি পেতে পারে বলে ধারণা করা হলেও সিনেটের লড়াই এখনো অনিশ্চিত। ফ্রান্সের বিক্ষোভকে ঘিরে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতাদের বক্তব্য তাই শুধু অভিবাসননীতি বা ইউরোপের পরিস্থিতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থের অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই নির্বাচনী প্রচারে এসব বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে।
