মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আর নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান ও ইসরাইলের সঙ্ঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক তৎপরতা এবং আফ্রিকার শৃঙ্গের গৃহযুদ্ধ— সবকিছু ক্রমে একই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ— হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মানদেব।
ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে সদ্য প্রকাশিত অ্যালান বসওয়েলের ‘দ্য নিউ রেড সি ওয়ারস’ নিবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত রয়েছে। সুদানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিভাবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, তার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার শৃঙ্গের সঙ্ঘাতকে আর আলাদা করে বোঝার সুযোগ নেই। ৩ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সুদানের যুদ্ধকে ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ঘিরে নতুন লড়াই এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার ওপর চাপ সঙ্কট আরো তীব্র করেছে। একই সময়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন কাঠামো গড়ার সম্ভাবনা সামনে এনেছে। প্রশ্ন হলো, এই কাঠামো কি সঙ্ঘাত প্রতিরোধ করবে, নাকি বৃহত্তর শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন সামরিক মাত্রা দেবে?
লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ
লোহিত সাগর এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সংযোগপথ। দক্ষিণে বাব আল-মানদেব প্রণালী পেরিয়ে জাহাজগুলো এডেন উপসাগরে প্রবেশ করে; এরপর ভারত মহাসাগরে পড়ে। উত্তরে সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছানোর পথ খুলে দেয়। ফলে এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজ যেতে হবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে। এতে যাত্রার সময়, জ্বালানি ব্যয়, বীমা প্রিমিয়াম ও সরবরাহব্যবস্থার খরচ বেড়ে যায়।
এই পথের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যে নয়, জ্বালানি নিরাপত্তাতেও। পারস্য উপসাগর থেকে রফতানি করা তেল ও গ্যাসের বড় অংশের গন্তব্য এশিয়া ও ইউরোপ। হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প পাইপলাইন ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক রফতানি অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ে। কিন্তু লোহিত সাগরেও যদি নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, তাহলে বিকল্প পথের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়। অর্থাৎ, হরমুজ ও বাব আল-মানদেব দু’টি আলাদা সঙ্কট নয়। দু’টি পথ একসাথে ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুতর হুমকিতে পড়ে।
ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাতের বিস্তৃত মানচিত্র
ইরান-ইসরাইল সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সমুদ্রপথের ওপর চাপ প্রয়োগের মতো উপায়ও ব্যবহৃত হচ্ছে। হুথি আন্দোলন লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
তবে হুথিদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ তেহরানের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত বলে ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। ইরানের সহায়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হলেও হুথিদের সিদ্ধান্তের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, স্থানীয় স্বার্থ জড়িত।
একইভাবে ইসরাইলের নিরাপত্তা কৌশলও কেবল নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর সামরিক শক্তি এবং সমুদ্রপথে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলার প্রশ্নও তার কৌশলগত হিসাবের অংশ। এর ফলে ইয়েমেন, লোহিত সাগর, লেবানন, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চল পরস্পর সংযুক্ত নিরাপত্তাবলয়ে পরিণত হচ্ছে।
বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, একটি এলাকায় সীমিত সামরিক পদক্ষেপ অন্য এলাকায় পাল্টা আঘাতের যুক্তি তৈরি করছে।
ইয়েমেন : স্থানীয় যুদ্ধ থেকে সামুদ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ইয়েমেনের যুদ্ধকে শুধু সরকার ও হুথিদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর আন্তর্জাতিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। দেশটির পশ্চিম উপকূল, মোখা বন্দর এবং বাব আল-মানদেবের আশপাশের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা মানে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করা।
এখানে সৌদি আরবের উদ্বেগ দ্বিমুখী। একদিকে তার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা; অন্যদিকে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানি এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের বৃহৎ পরিকল্পনা। সৌদি আরবের বন্দর, বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও পর্যটন প্রকল্পগুলো নিরাপদ না থাকলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অভিযান ও পাল্টা হামলায় ইয়েমেনের যুদ্ধ আবারো বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কিন্তু সামরিক অভিযানে ভূখণ্ড পুনর্দখল করলেই রাজনৈতিক সমাধান হয় না। এজন্য দরকার স্থানীয় পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং বাইরের শক্তির সামরিক প্রতিযোগিতা কমানো।
সুদানের যুদ্ধ : আলাদা ফ্রন্ট, একই ভূরাজনীতি
লোহিত সাগরের পশ্চিমতীরে সুদানের অবস্থান সমীকরণ আরো জটিল করেছে। সুদানের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের প্রভাব প্রতিবেশী রাষ্ট্র, শরণার্থী চলাচল, অস্ত্রের বিস্তার এবং লোহিত সাগরের বন্দরকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার ওপর পড়ছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বার্থ ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। বসওয়েলের বিশ্লেষণের তাৎপর্য হলো, অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত যখন বাইরের শক্তিগুলোর স্বার্থের সাথে যুক্ত হয়, তখন যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগও বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। সুদান, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরকে একই কৌশলগত মানচিত্রে রাখলে বোঝা যায়, আফ্রিকার শৃঙ্গ আর মধ্যপ্রাচ্য পরস্পরের পরিপূরক নিরাপত্তা অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।
মক্কা জোট : প্রতিরোধের নতুন ডকট্রিন
৭ আগস্ট ২০২৬ মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তির ঘোষিত মূলনীতি হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তিটির কৌশলগত তাৎপর্য তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের সামরিক শিল্প ও ন্যাটো-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের বৃহৎ সামরিক সক্ষমতা একই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘোষিত সক্ষমতা আর বাস্তবে সমন্বিত সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা এক নয়। যৌথ কমান্ড, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌ-নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলে দেবে।
দ্বিতীয়ত, এই চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হতে পারে।
তৃতীয়ত, চুক্তির ঘোষিত প্রতিরক্ষামূলক চরিত্রের সাথে বাস্তব কৌশলগত প্রতিযোগিতার সম্পর্ক কিভাবে নির্ধারিত হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চুক্তিকে কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। সৌদি পক্ষও একে সামরিক অক্ষ হিসেবে উপস্থাপন না করার কথা জানিয়েছে।
তবে এক পক্ষের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি অন্য পক্ষের কাছে আক্রমণের প্রস্তুতি বলে প্রতীয়মান হতে পারে। তাতে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ে। ফলে মক্কা চুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং সঙ্কটকালীন যোগাযোগ, কূটনীতি ও উত্তেজনা প্রশমনের ব্যবস্থার ওপরও।
১১ অক্টোবরের হামলা : প্রতিরোধ-ডকট্রিনের প্রথম বড় পরীক্ষা
মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হওয়ার খবর দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের দুই নাগরিকও ছিলেন। ১১ অক্টোবর বিমানবন্দরে আবার হামলা হয়। হুথিরা হামলার দায় স্বীকার করেছে; সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাল্টা অভিযান জোরদার করেছে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বড় হলেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা কঠিন। বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দর আক্রান্ত হলে শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও জনমনের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে মক্কা চুক্তির সামনে তিনটি পরীক্ষা। প্রথমত, সদস্যরাষ্ট্রগুলো কত দ্রুত সমন্বিত প্রতিরক্ষা সহায়তা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, হুমকি মোকাবেলায় গোয়েন্দা তথ্য ও আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা সমন্বিত হয়। তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপকে বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনায় পরিণত না করে কিভাবে সঙ্ঘাত সীমিত রাখা যায়।
ইসরাইলের স্বার্থ কোথায় : পাঁচ কৌশলগত ব্যাখ্যা
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইসরাইল কি শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাত তৈরি করতে চায়, নাকি ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে নিজের কৌশলগত সুবিধা বাড়াতে চায়?
ইরান ও সৌদি আরব দীর্ঘস্থায়ী সামরিক প্রতিযোগিতায় জড়ালে উভয় দেশের অর্থ, অস্ত্র, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও কূটনৈতিক মনোযোগের বড় অংশ আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ব্যয় হবে। এতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক চাপ তৈরির সক্ষমতা দুর্বল হবে। তবে সৌদি আরবের সাথে সঙ্ঘাত বাড়লে ইসরাইলের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হুথি হামলায় ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর ইলাত এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরাইল এ কারণে ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। একই সাথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সাথে নৌ-নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু হুথিদের হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইসরাইলের নিজেরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
ইরান ও হুথিদের হামলার ঝুঁকি সৌদি আরবকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। ইসরাইল এই সক্ষমতার সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে।
ইরান-সৌদি দ্বন্দ্বকে শিয়া-সুন্নি পরিচয়ের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করা হলে রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধ ধর্মীয় মেরুকরণে রূপ নিতে পারে। এতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন, ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ই সঙ্ঘাতের একমাত্র কারণ নয়।
গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা তথ্য
ইসরাইলের স্বার্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি তথ্য উপেক্ষা করা যাবে না। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Al-Monitor-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ সৌদি আরবের সাথে হুথিদের সঙ্ঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক ছিল এবং ইয়েমেনে আগাম হামলার বিরোধিতা করেছিল। অর্থাৎ, সৌদি-হুথি সঙ্ঘাত ইসরাইলের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে; কিন্তু একই সাথে নতুন নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করে।
তাহলে শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাত কি ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্য
এখানে তিনটি স্তর আলাদা করা প্রয়োজন। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে; হুথিরা ইরানের সহায়তা পায়। চলমান সঙ্ঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ইসরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সমন্বয় কঠিন হতে পারে। ইসরাইল সেই বিভাজন থেকে সুবিধা পেতে পারে।
ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে ইরান-হুথি-সৌদি সঙ্ঘাতকে শিয়া-সুন্নি যুদ্ধে রূপান্তর করছে। তাদের কৌশলগত পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
সার কথা হলো, ইসরাইলের সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধা ধর্মীয় যুদ্ধ সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা-চাহিদাকে কাজে লাগানো, লোহিত সাগরে নিজের অবস্থান সুরক্ষিত রাখা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ধরনকে প্রভাবিত করার মধ্যেও রয়েছে। তবে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়লে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন ঐক্যও তৈরি হতে পারে— বিশেষত ফিলিস্তিন প্রশ্নে।
তাই শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাত ইসরাইলের জন্য নিশ্চিত লাভ নয়; এটি এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, যার ফল নির্ভর করবে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত, যুদ্ধের বিস্তার এবং কূটনীতির কার্যকারিতার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের কাছে লোহিত সাগরের এই সঙ্কট দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি, পোশাক রফতানির সরবরাহব্যবস্থা এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন— সব কিছুর সাথে এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
হরমুজ ও লোহিত সাগরে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বীমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। দীর্ঘ পথ ঘুরে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন হলে সময়সূচি বিঘ্নিত হয়, কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ে এবং রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে। অবশ্য এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সঙ্ঘাতের স্থায়িত্ব, বিকল্প সরবরাহপথ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নির্দেশনা, প্রয়োজন হলে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হলে বিকল্প যাত্রাপথের প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের উচিত সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে অবস্থান নেয়া। কোনো সামরিক জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন, বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষা, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেয়া বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ
প্রথম সম্ভাবনা, মক্কা চুক্তি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে হামলার ঝুঁকি কমবে। এ ক্ষেত্রে জোটটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সহায়ক হতে পারে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে উত্তেজনা আরো তীব্র হবে। পাল্টাপাল্টি হামলা, অস্ত্রের বিস্তার এবং নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে নিরাপত্তা অর্জনের উদ্দেশ্যেই নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাবনা, ইয়েমেন ও সুদানের সঙ্ঘাত, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা সঙ্কট পরস্পরকে শক্তিশালী করে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। এ পরিস্থিতিতে কোনো একটি যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক সঙ্কটের সমাধান হবে না।
যুদ্ধের ভূগোল বদলাচ্ছে, বদলাতে হবে কূটনীতিও
সামরিক জোটের সাফল্য কেবল কত সৈন্য, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র একত্র করা গেল, তার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে হুমকি সঠিকভাবে শনাক্ত করা, বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষের সাথে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার ওপর।
ইরানকে ঘিরে সঙ্ঘাতের সমাধান, ইয়েমেনে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং সুদানে যুদ্ধ বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া লোহিত সাগরে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। মক্কা জোট যদি কেবল সামরিক প্রতিক্রিয়ার কাঠামো না হয়ে সঙ্ঘাত প্রতিরোধ ও কূটনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যথায়, যে সমুদ্রপথ বিশ্বকে যুক্ত করে, সেটিই বিভক্তির রেখায় পরিণত হবে। আর সেই বিভাজনের মূল্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার মানুষকে নয়, বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকেও দিতে হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mrkmmb@gmail.com
