সারাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজামণ্ডপে সাজসজ্জা, নতুন পোশাক পরা আর উৎসবের আনন্দে মেতেছেন সবাই। তবে রংপুরের তারাগঞ্জে মবের শিকারে নিহত রূপলাল রবিদাসের পরিবারে নেই পূজার সেই আনন্দ। শোক, অভাব-অনটন আর ঝুলে থাকা বিচারে বেদনায় দিন কাটছে পরিবারটির।
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট মেয়ে নুপুর দাসের বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে জামাতা প্রদীপ রবিদাসকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন রূপলাল রবিদাস। পথে তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের বুড়ীরহাট ছেতরা বটতলা এলাকায় ভ্যানচোর সন্দেহে উত্তেজিত জনতা তাদের গণপিটুনি দেন। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন রূপলাল রবিদাস। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার ভাগ্নি জামাতা প্রদীপ রবিদাস।
এ ঘটনার পর মামলা হয়। বাদী হয়ে তারাগঞ্জ থানায় ৭০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন রূপলাল দাসের স্ত্রী মালতী রাণী রবিদাস। এরপর বেশ কিছু আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে তারা সবাই এখন আছেন জামিনে।
অথচ স্বামীকে হারানোর পর থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন মালতী রবিদাস। অন্য পরিবারগুলো যখন দুর্গাপূজার আনন্দে মেতেছে, তখন তাদের ঘরে নেই নতুন পোশাক কেনার টাকা। নেই সাজসজ্জা কিংবা অতিথি আপ্যায়নের সামর্থ্য। সংসারের অভাব আর স্বজন হারানোর শোক তাদের কাছে পূজার আনন্দকে করেছে ম্লান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মালতী দাস বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে আমরা আজও দিশাহারা। পূজার আনন্দ করার মতো আমাদের না আছে মানসিকতা, না আছে সামর্থ্য। সবাই যখন আনন্দ করছে, আমরা তখন শুধু কাঁদছি।’
তিনি বলেন, ‘যারা আমার সন্তানদের এতিম করেছে, আমাকে বিধবা করেছে, আমার শাশুড়িকে করেছে সন্তানহারা, আমরা তাদের বিচার চাই। জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমাদের কপালে ভগবান সুখ রাখে নাই। এলাকার সবাই যখন পূজায় আনন্দ করছে, তখন আমার সন্তানদের চোখে জল।’
রূপলাল দাসের ছেলে জয় দাস বলেন, ‘আমার বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে, আমাদের পরিবারের অস্তিত্ব ধ্বংস করেছে। আমাদেরকে অন্যের দ্বারস্থের শিকার করে পথে বসিয়েছে। এখন ঠিকমতো তিনবেলা খেতেই পারি না, আমাদের আর পূজা আছে। পূজার কেনাকাটা আর আনন্দ করা আমাদের কাছে এখন বিলাসিতা।’
হত্যার শিকার রূপলাল দাসের পরিবারেও দুর্গাপূজা এসেছে ঠিকই কিন্তু আনন্দ নিয়ে নয়, স্বজন হারানোর বেদনা আর অভাব অনটের অসহায়ত্বে। অন্যদের ঘরে যখন উৎসবের আলো, তখন তাদের ঘরে শোক আর অনিশ্চয়তা। পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, রূপলাল হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রীর করা মামলায় ১৯ জনকে আটক করা হয়েছিল। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। শিগগিরই আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাববর হোসেন বলেন, পূজা উপলক্ষে রূপলালের পরিবার উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আপনার মাধ্যমে সমস্যার বিষয়টি জেনে কিছু নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ও শাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
