বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জন তরুণ মিলে আশাজাগানিয়া একটি কাজ করেছেন। নিজেদের হাতখরচ আর টিউশনির টাকায় তাঁরা নির্মাণ করেছেন একটি সিনেমা। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন ও সর্বাত্মক শাটডাউনের মধ্যেই শুক্রবার মুক্তি পেল ‘অন্যপাতা’ নামের সিনেমাটি। চলচ্চিত্রটির মূল বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধ। প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের ১০টি প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি চলবে।
যে তরুণেরা এই অস্থির সময়ে মারামারি, হানাহানি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মববাজির সঙ্গে যুক্ত না হয়ে নিজেদের সৃজনশীলতাকে লালন করে সিনেমা তৈরি করেছেন, তাঁদের সাধুবাদ জানানো দরকার। সত্যিই, স্রোতের বিপরীতে এ এক অনন্য অর্জন। সংস্কৃতিই মানুষকে আরও একটু চর্চিত, নান্দনিক জীবনের সন্ধান দেয়। সেই সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করার এই ভাবনা অন্য আরও অনেক তরুণকে সৃজনশীলতার পথে টেনে আনবে—এ রকম আশা করাই যায়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষায়তনে শিক্ষারত তরুণেরা তাঁদের মনন ও সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটালে, তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সমাজে।
সিনেমাটি তৈরির মাধ্যমে এই তরুণেরা দেখিয়ে দিয়েছেন, ইতিবাচক পথে থাকলে তা তরুণ প্রজন্মের আত্মপ্রকাশে সহায়তা করে, প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃষ্টিশীল থাকতে প্রত্যয়দীপ্ত করে এবং তাতে সমাজকে নতুনভাবে দেখার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। একটি সমাজ যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তরুণদের এমন উদ্যোগ কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সে বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলা যাক।
এই চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠতে পারে হতাশার বিপরীতে সম্ভাবনার বার্তা। বর্তমান অস্থির সময়ে তরুণদের অনেকেই দিশাহীন জীবনযাপন করছেন। সামাজিক দায় পালনেও উদাসীন হয়ে পড়ছেন অনেকে। এরই মধ্যে যখন সমস্যা থেকে উত্তরণের সৃজনশীল একটি পথ কেউ তৈরি করেন, তখন বোঝা যায়, আশা একেবারে মরে যায়নি। একটি সিনেমা হয়তো সামাজিক হতাশা দূর করতে পারবে না, কিন্তু তা আশাবাদী চিন্তার পরিসর গড়ে দিতে পারে। সেই সঙ্গে এ কথাও বলা দরকার, সামগ্রিকভাবে সবকিছুই রাজনীতির পরিসরে নিবদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতার মধ্যে রাজনীতির বাইরে সমাজের অন্য ভাষা তৈরিতে তা অবদান রাখবে। রাজনৈতিক বোঝাপড়ার জায়গায় সাংস্কৃতিক সম্ভাবনাগুলো যখন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সমাজও এগিয়ে যাওয়ার ভাষা পায়। রাজনীতি থেকে পালিয়ে গিয়ে নয়, বিবদমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে রাজনীতির চেয়েও বড় পরিসরে জীবনকে দেখার সম্ভাবনাও এতে তৈরি হয়।
৬ জন থেকে ৪০ জনের দল হয়ে ওঠা এই তরুণেরা তাঁদের আত্মবিশ্বাসের মশালটি দৃপ্ত হাতে তুলে ধরুক। স্বাধীন চিন্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেদের ভাষা খুঁজে পাওয়ার এই বার্তাটি পৌঁছে যাক সব শিক্ষালয়ে। তরুণদের এই সৃজনশীল কাজটি দর্শকদের কাছে পৌঁছে যাক। আলোচনার জন্ম দিক। সংস্কৃতির শক্তিকে সংহত করুক।
সৃজনশীল সংস্কৃতি এসে জায়গা করে নিক সবখানে, অন্তত এই ভরসা যেন করা যায়, যাতে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত সৃজনশীল শক্তি সমাজে দাঁড়িয়ে যাবে।
