সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত হাত ধোয়ার অবকাঠামো নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় সরেজমিন অনুসন্ধানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থার এই চরম বেহাল দশা এবং সরকারি অর্থের এমন অপচয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। করোনাকালে জনসচেতনতা বাড়াতে এসব স্থাপনা তৈরি করা হলেও বর্তমানে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও জবাবদিহির অভাবে তা কোনো কাজেই আসছে না।
নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনিক কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে হাত ধোয়ার অবকাঠামোর বেহাল চিত্র সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে থাকা ২২টি ট্যাপের একটিও বর্তমানে সচল নেই; শ্যাওলা, ধুলোবালি ও ময়লা জমে থাকা জরাজীর্ণ বেসিনগুলোতে নেই পানির সামান্যতম সংযোগও। একই ধরনের অবহেলা দেখা গেছে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে থাকা ১৭টি বেসিন ও ট্যাপের ক্ষেত্রেও। এছাড়া ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল এবং জেলার সোনারগাঁ উপজেলার মোগড়াপাড়া এইচজিজিএস স্মৃতি সরকারি বিদ্যানিকেতনেও হাত ধোয়ার কার্যকর কোনো সুব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টির অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সেফা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বেসিন নষ্ট থাকায় তারা নিয়মিত হাত-মুখ ধুতে পারছে না, যা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহ আলম বাজেট স্বল্পতার কথা তুলে ধরে জানান, সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরাদ্দে ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ে কিছু মেরামতের কাজ করা হলেও পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী নাহিদ হোসেন দাবি করেন, চাহিদা অনুযায়ী নতুন বরাদ্দ পেলে দ্রুত মেরামতের কাজ করা হবে। সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনসাধারণের জন্য হাত ধোয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। অকেজো বেসিন ও ট্যাপগুলোর কারণ খতিয়ে দেখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় মেরামতের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
নরসিংদী ও মানিকগঞ্জ জেলার চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। নরসিংদী সদর হাসপাতালে তিনটি বেসিন-ট্যাপের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ অচল এবং পৌরসভা কার্যালয়ে থাকা তিনটি বেসিন-ট্যাপের সব কটিই অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এমনকি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান ফটকের সামনের বেসিনটি চরম অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ধুঁকছে। এ বিষয়ে নরসিংদী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম দাবি করেন, করোনার সময় অস্থায়ীভাবে এসব বেসিন স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টরাই তা খুলে নিয়ে গেছেন। তবে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী (এস্টিমেটর) হালিমা আক্তার সম্পূর্ণ বিপরীত মন্তব্য করে বলেন, সে সময় স্থাপন করা বেসিন-ট্যাপগুলো স্থায়ীভাবে বসানো হয়েছিল, যা তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে মানিকগঞ্জ শহরের বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মূল ফটকের পাশে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেসিনটি সম্পূর্ণ অকেজো পড়ে থাকার পাশাপাশি দখল করে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই বেসিনের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। মানিকগঞ্জ সদর থানার মূল ফটকের পাশের অকেজো বেসিনটির বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন জানান, করোনার সময়ে স্থাপিত এই বেসিনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে এটি মেরামতের জন্য চিঠি পাঠানো হবে। তবে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. মহাবুল ইসলাম দায় এড়িয়ে বলেন, বেসিনগুলো স্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদেরই।
অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঢোকার মুখে স্থাপিত বেসিনটিতে পানির সংযোগ থাকলেও সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের কোনো বালাই নেই। গাছের পাতা জমে ময়লার স্তূপে পরিণত হওয়া এই বেসিনটি কোনো কাজেই আসছে না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আশরাফুল ইসলাম, স্থানীয় বাসিন্দা রেজুয়ান তানভীর খান ও রোগী টিটু মিয়া তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, জঘন্য পরিবেশের কারণে বেসিন থেকে পানি পড়ে উপকার তো দূরের কথা, উলটো রোগ জীবাণু ও ময়লা ছড়াচ্ছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অতি দ্রুত এসব অকেজো অবকাঠামো সচল করার পাশাপাশি কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
