১৯ অক্টোবর, আমার জন্মদিন। কাগজে-কলমে বয়স ২৯ হলো। অথচ এই বয়সটা মাত্র সাত দিনেই আটকে যেতে পারত! জন্মের ঠিক এক সপ্তাহ পর আমার ভয়াবহ ডায়রিয়া হলো। দিনে ৬০-৭০ বার পাতলা পায়খানা! সাত দিনের ছোট্ট একটা শরীর, তার ভেতরে আর কী-ই বা থাকে! একপর্যায়ে ডাক্তারও হাল ছেড়ে দিলেন। আব্বু-আম্মুকে ডেকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ‘এই বাচ্চা বাঁচবে না, আপনারা মানসিক প্রস্তুতি নিন।’ এরপরও একদম শেষ আশা হিসেবে আমার শিরায় স্যালাইন চলল, দেওয়া হলো অক্সিজেন। আমি টিকে গেলাম।
সেই দিনগুলোর কথা আমার নিজের কোনো স্মৃতিতে নেই। থাকার কথাও নয়। জীবনের প্রথম মুখ ফুটে বলা শব্দ কিংবা প্রথম হাঁটতে শেখার গল্প মানুষ যেমন বাবা-মায়ের কাছে শোনে, আমিও তেমনি আব্বু-আম্মুর মুখে শুনেছি আমার মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসার সেই গল্প। কিন্তু বড় হতে হতে একটা ভাবনা অনেকটা অবচেতনভাবেই আমার ভেতরে গেঁথে গেছে—ওই সাত দিনের পর থেকে জীবনে আমি যা কিছু পাচ্ছি, তার পুরোটাই বোনাস! কোনো একটা মুহূর্ত এদিক-সেদিক হলেই এই সময়টুকু আমি আর পেতাম না।
তাই প্রতি জন্মদিনেই একটা প্রশ্ন আমার কাছে ফিরে ফিরে আসে—এই ধার করা সময়টুকু দিয়ে আমি আসলে কী করলাম?
আমার সব চিন্তাভাবনাকে ঘিরে থাকত ক্লান্তি আর অবসাদ। চারপাশের এই নিরন্তর খাটুনি আর মেকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মকানুন দেখে মনে হতো, এই পৃথিবীটা বুঝি আমার মতো মানুষের জন্য নয়।
সত্যি বলতে, এই ধার করা সময়টাকে সব সময় আমার উপহার মনে হয়নি। জীবনে ট্রমা এসেছে, ধাক্কা এসেছে। এমন কিছু অন্ধকার সময় গেছে, যখন মনে হয়েছে, বেঁচে থাকার এই ক্লান্তি আর নেওয়া যাচ্ছে না। সাত দিন বয়সে ডায়রিয়া যখন টেনেই নিচ্ছিল, তখন চলে গেলেই বোধ হয় ভালো হতো। না থাকাতেই বরং শান্তি ছিল।
সাত-আট বছর আগের লেখালেখি বা ডায়েরিগুলো খুললে দেখি, তখনকার আমি পৃথিবীটাকে দেখতাম একটা নিষ্ঠুরতার কারখানা হিসেবে। মনে হতো, জন্মের পর থেকেই সবাইকে নামিয়ে দেওয়া হয় এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায়। নিজের মেধা বাড়াও, মার্কেটপ্লেসে বেচো, নিজেকে প্রমাণ করো। একটা কাজ শেষ করো, তারপর আরও হাজারটা শেষ করো, তবু যেন কখনো যথেষ্ট হয় না! মৃত্যু অবধারিত জেনেও মানুষ এত পরিশ্রম কীভাবে করে? আমার সব চিন্তাভাবনাকে ঘিরে থাকত ক্লান্তি আর অবসাদ। চারপাশের এই নিরন্তর খাটুনি আর মেকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মকানুন দেখে মনে হতো, এই পৃথিবীটা বুঝি আমার মতো মানুষের জন্য নয়।
একুশ বছরের সেই ছেলেটাকে আমি আজও চিনি। তার সেই ক্লান্তি আমার অচেনা নয়, তার সব অভিযোগ যে রাতারাতি মিথ্যে হয়ে গেছে তা-ও নয়। কিন্তু আজ উনত্রিশে দাঁড়িয়ে দেখি, আমি আর পুরোপুরি সেই মানুষটা নেই। কারণ, এখন আমি জানি, পৃথিবীর সবাই সেই একুশ বছরের সাদমানের মতো করে ভাবলে আমাকে সাত দিনেই থেমে যেতে হতো। একুশ পেরিয়ে উনত্রিশে আর আসা হতো না।
এই E. coli বা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রজাতি মারাত্মক ডায়রিয়া ঘটাতে পারে। জন্মের প্রথম সপ্তাহে আমার শরীরেও হয়তো হানা দিয়েছিল এদেরই কোনো এক জাতভাই।
সাত দিনের আমাকে যে ডায়রিয়া প্রায় মেরেই ফেলেছিল, একসময় সেই ডায়রিয়ায় অগণিত শিশু মারা যেত। কেন তারা মারা যাচ্ছে, কীভাবে তাদের বাঁচানো যায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমার জন্মের বহু আগে থেকেই লেগে ছিলেন অনেক মানুষ। ১৮৮৫ সালে থিওডর এশেরিক নামের এক জার্মান চিকিৎসক শিশুদের অন্ত্রের জীবাণু ও ডায়রিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তাদের মল থেকে একটি ব্যাকটেরিয়া আলাদা করেছিলেন। পরে তাঁর নামেই জীবাণুটির নাম রাখা হয় Escherichia coli। একে আমরা সংক্ষেপে বলি E. coli বা ই. কোলাই। এই ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রজাতি মারাত্মক ডায়রিয়া ঘটাতে পারে। জন্মের প্রথম সপ্তাহে আমার শরীরেও হয়তো হানা দিয়েছিল এদেরই কোনো এক জাতভাই।

তবে শত্রুকে চেনা আর রোগীকে বাঁচানো এক কথা নয়। মারাত্মক ডায়রিয়ায় শরীর থেকে দ্রুত পানি আর প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। মানুষকে তাই বুঝতে হয়েছে, ঠিক কী হারিয়ে যাচ্ছে, আর কীভাবে সেটা ফিরিয়ে দিলে একটা শরীর আবার বেঁচে ওঠে। শিরায় দেওয়ার স্যালাইনে কোন উপাদান কতটা থাকবে, একটা শিশুর শরীরে কতটা দিতে হবে—এই জ্ঞান এক দিনে তৈরি হয়নি। এর একটা বড় অংশ এসেছে খোদ ঢাকা থেকেই, যে শহরের এক হাসপাতালে শুয়ে ক্ষীণকায় আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলাম।
১৮৮৫ সালে থিওডর এশেরিক নামের এক জার্মান চিকিৎসক শিশুদের অন্ত্রের জীবাণু ও ডায়রিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তাদের মল থেকে একটি ব্যাকটেরিয়া আলাদা করেছিলেন।
ষাটের দশকে আমেরিকান এনআইএইচের ফান্ডিংয়ে ঢাকার মহাখালীতে গড়ে ওঠে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি বা আজকের আইসিডিডিআর,বি। সেখানকার গবেষকেরা রোগীকে ওজন করে, বিশেষ কলেরা কটের নিচে মাপার পাত্র বা মেজারিং বাকেট রেখে মাপতেন শরীর থেকে ঠিক কতটা পানি আর কোন লবণ কতটুকু বেরিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকেই তৈরি হলো সোডিয়াম, পটাশিয়াম আর অ্যাসিটেটের নির্দিষ্ট অনুপাতের আইভি স্যালাইন। চিকিৎসাবিজ্ঞান যাকে এখনো চেনে ‘ঢাকা সলিউশন’ নামে। আর সেই একই ল্যাবের গবেষণার ধারাবাহিকতায় পরে জন্ম নিল মুখে খাওয়ার স্যালাইনও—আমাদের ঘরে ঘরে চেনা এক চিমটি লবণ আর এক মুঠো গুড়।
এর কয়েক দশক পর, আইসিডিডিআরবি থেকে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দূরের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে আমার জন্ম। সেখানকার স্টোরে থাকা একটা স্যালাইনের ব্যাগ সেদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ল্যাবরেটরির সেই ফর্মুলাকে কারখানায় স্যালাইনের ব্যাগে রূপ দেওয়া আর ঠিক সময়ে হাসপাতালের সেলফে পৌঁছে দেওয়ার পেছনেও ছিল অসংখ্য মানুষের শ্রম। পরে ইন্ডাস্ট্রির সাপ্লাই চেইন আর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি নিজের চোখে দেখেছি, সামান্য একটা জিনিসও নির্ভুলভাবে আর ঠিক সময়ে মানুষের হাতে পৌঁছাতে কত মানুষের কত ঘাম ঝরে!
কয়েক দশক পর, আইসিডিডিআরবি থেকে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দূরের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে আমার জন্ম। সেখানকার স্টোরে থাকা একটা স্যালাইনের ব্যাগ সেদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
আমি সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম কারণ আমার জন্মের বহু বছর আগে, আমারই শহরে কিছু অচেনা বিজ্ঞানী তাঁদের ল্যাবরেটরিতে বসে নাওয়াখাওয়া ভুলে একটা সমস্যার পেছনে পাগলের মতো লেগে ছিলেন। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম কারণ কোনো এক কারখানায় অচেনা কর্মীরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে, হয়তো বিরক্তি নিয়েই, স্যালাইন আর ওষুধের মান ঠিক রেখেছিলেন। আর আমি বেঁচে গিয়েছিলাম কারণ কোনো এক ক্লান্ত ডাক্তার আর নার্স নিজেদের জীবনের অবসাদ আর সংসারের টানাপোড়েন সরিয়ে রেখে সেদিন রাতে এক নবজাতকের ছোট্ট শিরা খুঁজে সুই ফুটিয়েছিলেন।
একুশ বছরের আমি প্রকৃতিকে ভাবতাম নিষ্ঠুর। কিন্তু প্রকৃতি আসলে স্বভাবগতভাবে নিষ্ঠুর বা দয়ালু কোনোটাই নয়। সে চলে নিজস্ব নিয়মে, নির্মোহ আর নির্বিকারভাবে। হাত ফসকে পড়া গ্লাস কারও মায়ায় মাঝপথে থেমে যায় না, আগুন আপন-পর চেনে না, নদীর স্রোত কারও কান্নায় উল্টো দিকে বয় না। সাত দিনের একটা শিশুর অন্ত্রে ঢুকে পড়া ব্যাকটেরিয়াও তাই এক থেকে দুই, দুই থেকে চার হয়ে বাড়তেই থাকে, আর তার ধাক্কায় শরীর বের করে দিতে থাকে পানি ও লবণ। শরীরটা কার, কত ছোট, তাকে ঘিরে কত মানুষের কত মায়া; সেই হিসাব প্রকৃতির খাতায় থাকে না।
আমি বেঁচে গিয়েছিলাম কারণ কোনো এক ক্লান্ত ডাক্তার আর নার্স নিজেদের জীবনের অবসাদ আর সংসারের টানাপোড়েন সরিয়ে রেখে সেদিন রাতে এক নবজাতকের ছোট্ট শিরা খুঁজে সুই ফুটিয়েছিলেন।
সেই নির্মোহ বাস্তবতার মাঝেই মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে একটা শিশুকে বাঁচাতে বহু মানুষের জ্ঞান আর শ্রম একসঙ্গে কাজে লাগে। প্রকৃতির নিয়মকে তো মানুষ বদলাতে পারে না; কিন্তু যুগ যুগ ধরে সেই নিয়মগুলোকেই একটু একটু করে বুঝে, এক নিয়মকে আরেক নিয়মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মানুষ ঠিকই অগণিত প্রাণ বাঁচিয়ে তোলে। আজ পৃথিবীতে শিশুমৃত্যুর হার যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন। এই অর্জনের পেছনেও তো আছে মানুষের সেই অস্থির, প্রতিযোগিতামূলক আর কখনোই তৃপ্ত না হওয়া সিস্টেমটা, যার ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে বিপুল কর্মযজ্ঞ আর সংগঠন।
বেশির ভাগ মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে ‘মানবসভ্যতা এগিয়ে নেব’ ভেবে কাজে যায় না। আমিও যাই না। আমার স্বভাবও তো অলসতা আর আরামের দিকেই ঝোঁকে। তবু জীবনের বেশির ভাগ সময় আমি খেটেছি। খেটেছি কারণ চারপাশের প্রত্যাশা আর চাপ আমার ভেতর থেকে এমন শ্রম বের করে এনেছে, যা শুধু নিজের ইচ্ছেমতো চললে হয়তো সুপ্তই থেকে যেত। পৃথিবীজুড়ে প্রতিদিন এটাই ঘটছে, অকল্পনীয় স্কেলে। লাখো মানুষ স্রেফ রুটিরুজি আর ক্যারিয়ারের তাগিদে রোজ যাঁর যাঁর কাজটুকু করে যাচ্ছেন; অথচ তাঁরা জানেনও না, তাঁদের সেই সাধারণ কাজটা শেষ পর্যন্ত কার জীবনে গিয়ে পৌঁছাবে।
প্রকৃতির নিয়মকে তো মানুষ বদলাতে পারে না; কিন্তু যুগ যুগ ধরে সেই নিয়মগুলোকেই একটু একটু করে বুঝে, এক নিয়মকে আরেক নিয়মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মানুষ ঠিকই অগণিত প্রাণ বাঁচিয়ে তোলে।
স্যালাইনের বাইরেও এ রকম কত গল্প আছে! এই যেমন পেনিসিলিনের কথাই ধরুন। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ল্যাবে বসে পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এরপরও এক দশকের বেশি সময় সেটা দিয়ে তেমন কাউকে বাঁচানো যায়নি। কারণ, ল্যাবের ছোট্ট পাত্রে যতটুকু পেনিসিলিন তৈরি হতো, তা দিয়ে লাখো মানুষের চিকিৎসা করা একরকম অসম্ভব ছিল। এই সমস্যার সমাধান যাঁরা করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ ইতিহাস গড়তে নামেননি। আমেরিকার এক ল্যাব-কর্মীর প্রতিদিনের ডিউটি ছিল শহরের বাজার ঘুরে পচা ফলমূল কুড়িয়ে আনা। সেই চাকরি করতে গিয়েই একদিন তিনি তুলে আনলেন এমন এক বাঙ্গি, যার গায়ে মিলল সবচেয়ে বেশি পেনিসিলিন দেওয়া এক ছত্রাক।
তারপর এক সফট ড্রিংকস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা নিজেদের কোম্পানির প্রজেক্ট নামাতে গিয়ে বের করলেন, কীভাবে বিশাল ট্যাংকে ওই ছত্রাক বিপুল পরিমাণে চাষ করা যায়। ঠিক এভাবেই চশমার দোকানের কারিগররা কাচ ঘষতে ঘষতে বানিয়েছিলেন প্রথম মাইক্রোস্কোপ আর টেলিস্কোপ, নিজেদের অফিসের ফাইল আদান-প্রদানের ঝামেলা কমাতে গিয়ে একদল প্রোগ্রামার জন্ম দিয়েছিলেন গোটা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের। আর ফিলিপাইনের ল্যাবে বানানো উচ্চফলনশীল ধানের জাত নিয়ে আমাদের ব্রি-এর গবেষণা ও মাঠের লাখো কৃষকের রোজকার শ্রম মিলে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ দেখা আমাদের দেশটা আজ তার তিন গুণ জনসংখ্যার প্রায় সবার পাতেই ভাত তুলে দিতে পারছে নিজেদের উৎপাদিত ধানেই। বলতে থাকলে এ রকম উদাহরণের আর শেষ হবে না।
ল্যাবের ছোট্ট পাত্রে যতটুকু পেনিসিলিন তৈরি হতো, তা দিয়ে লাখো মানুষের চিকিৎসা করা একরকম অসম্ভব ছিল। এই সমস্যার সমাধান যাঁরা করলেন, তাঁরা কিন্তু কেউ ইতিহাস গড়তে নামেননি।
হ্যাঁ, মানুষের তৈরি এই ব্যবস্থাটা নিখুঁত নয়। এর অনেক ত্রুটি আছে, আছে অনেক অবিচার। কাছ থেকে দেখলে মনে হয় সবাই বুঝি যাঁর যাঁর বিচ্ছিন্ন রেসেই দৌড়াচ্ছেন—নিজের রুটিরুজি, নিজের সাফল্য, নিজের একটু ভালো থাকার জন্য। কিন্তু একটু দূর থেকে, লম্বা সময় ধরে তাকালে দেখা যায়, এই আলাদা আলাদা দৌড়গুলোই একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। একজনের কৌতূহল, আরেকজনের বাঁধাধরা ডিউটি আর কিছু মানুষের অফিসের টার্গেট মিলেই তো একদিন পেনিসিলিন পৌঁছেছিল লাখো মানুষের কাছে। ব্যক্তিগত তাড়না এভাবেই রূপ নেয় সামষ্টিক মমতায়। এক প্রজন্মের সারা জীবনের পরিশ্রম হয়ে ওঠে পরের প্রজন্মের শুরুর জায়গা, আর ব্যক্তিগত রেসগুলো মিলে তৈরি হয় গোটা মানবজাতির এক বিশাল রিলে রেস।
যে দৃশ্য একসময় জীবনের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা জাগাত, সেখানেই আজ আমি দেখি অদ্ভুত এক সৌন্দর্য। ভাবি, কত অচেনা মানুষের নিজ নিজ দৌড় একদিন এসে মিলে গিয়েছিল আমার হাসপাতালের বেডের পাশে। এই রিলে রেসের কাছে তো আমার জীবনটাই ঋণী!
পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শেখার পর আমি তাই আবারও নিজেকে জিজ্ঞেস করি, এই ধার করা সময় দিয়ে আমি কী করলাম? আজ উনত্রিশে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি, না জেনেই আমি সারা জীবন হেঁটেছি ওই রিলে রেসের ট্র্যাকের দিকেই। ফিজিকস পড়েছি, কেমিস্ট্রি পড়েছি, বায়োলজি পড়েছি। এরপর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি একটা প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলে, মানুষ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে। তারপর প্রায় আট হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসেছি আমেরিকায়।
সহজ কথায়, এই E. coli এখন আমার ডিএনএ বানানোর ফ্যাক্টরি। যে জীবাণুটা একদিন আমার জীবনের গল্পটা প্রথম পৃষ্ঠাতেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল, আজ সে আমার সবচেয়ে বাধ্য সহকর্মী!
এখন এখানে বসে বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছি। সময়ের কী অদ্ভুত খেয়াল দেখুন—যে আমেরিকান এনআইএইচের ফান্ডিংয়ে একদিন ঢাকার ল্যাবে ডায়রিয়ার গবেষণা হয়েছিল, আজ সেই এনআইএইচের গ্র্যান্টেই চলে আমাদের রিসার্চ ল্যাব! আমেরিকার সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা এই সরকারি সংস্থাটি এভাবেই দশকের পর দশক ধরে হাজারো গবেষণার পেছনে রসদ জুগিয়ে চলেছে, যার হাত ধরে পৃথিবী পেয়েছে এমআরআই মেশিন, ক্যানসারের আধুনিক থেরাপি কিংবা হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের মতো অগণিত জীবনরক্ষাকারী আবিষ্কার। আজ সেই একই স্রোতের একজন হয়ে প্রতিদিন সকালে আমি ল্যাবে যাই, কোষ আর ব্যাকটেরিয়ার আবাদ করি, সেগুলো দিয়ে করি প্রোটিন ইঞ্জিনিয়ারিং।
আর কোন ব্যাকটেরিয়া নিয়ে আমি কাজ করি জানেন? E. coli। হ্যাঁ, সাত দিন বয়সী আমি যার হাতে মরতে বসেছিলাম, সেই E. coli। আজ আমি সেই E. coli দিয়ে করি মলিকিউলার ক্লোনিং। ওর ভেতরে পছন্দমতো ডিএনএ ঢুকিয়ে কলোনি তৈরি করি। যে ‘এক থেকে দুই, দুই থেকে চার’ নিয়মে ওরা একদিন আমার অন্ত্রে বাড়ছিল, সেই একই নিয়মে আজ ফ্লাস্কে ওদের লক্ষ গুণ বাড়াই। তারপর ওদের কোষ ভেঙে ভেতর থেকে ডিএনএটা বের করে নিই। সহজ কথায়, এই E. coli এখন আমার ডিএনএ বানানোর ফ্যাক্টরি। যে জীবাণুটা একদিন আমার জীবনের গল্পটা প্রথম পৃষ্ঠাতেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল, আজ সে আমার সবচেয়ে বাধ্য সহকর্মী!
সময়ের কী অদ্ভুত খেয়াল দেখুন—যে আমেরিকান এনআইএইচের ফান্ডিংয়ে একদিন ঢাকার ল্যাবে ডায়রিয়ার গবেষণা হয়েছিল, আজ সেই এনআইএইচের গ্র্যান্টেই চলে আমাদের রিসার্চ ল্যাব!
রাতদিন খেটে চলা এক অক্লান্ত শ্রমিক, যে আমাকে সাহায্য করছে অন্য মানুষের জন্য নতুন ওষুধ বা থেরাপিউটিক প্রোটিন বানানোর গবেষণায়। ঠিক এ রকম কোনো গবেষণাতেই সত্তরের দশকে এই E. coli বিজ্ঞানীদের হাতে পোষ মেনে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য তৈরি করেছিল প্রথম কৃত্রিম ইনসুলিন, যা ছিল আমার ডায়াবেটিক দাদা-দাদুর নিত্যদিনের সঙ্গী, আর এখন আব্বু ব্যবহার করেন প্রতিদিন।
এগুলো ভাবলে অবাক লাগে, বলতে গেলে একটু আবেগপ্রবণই হয়ে পড়ি। যে বিজ্ঞান একদিন সাত দিনের এক মুমূর্ষু শিশুকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, উনত্রিশ বছর ধরে একটু একটু করে পড়ে, শিখে আর নিজের অন্ধকার সময়গুলোর সঙ্গে লড়াই করে আজ ওই শিশুই সেই বিজ্ঞানের একটা অংশ হয়ে উঠেছে।
তাই এখন ল্যাবে যেতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোষ আর ডেটার পেছনে খাটতে মাঝে মাঝে ক্লান্ত লাগলেও একুশ বছর বয়সের সেই অবসাদটা আর কাজ করে না। মনে হয়, এই খাটুনির মধ্য দিয়েই আমি আমার ধার করা সময়ের ঋণ শোধ করছি, যাঁদের কাছে আমি ঋণী, তাঁদের কাউকে কোনো দিন না চিনেই। হয়তো আমার আজকের এই সামান্য গবেষণা মিশে যাবে বিজ্ঞানের সেই বিশাল নদীতে, যার স্রোত একদিন গিয়ে পৌঁছাবে এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে আর কোনো ডাক্তারকে কোনো বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে বলতে হবে না, ‘এই বাচ্চা বাঁচবে না।’
বোনাস পাওয়া এই জীবনটার জন্য এতটুকুই বা কম কী!
