বাংলাদেশে বর্তমানে লাভ বার্ড পালনের প্রবণতা অনেক বেড়েছে। ঘরের শখের পাখি থেকে এখন এটি হয়ে উঠছে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। দেশের অন্যতম বড় লাভবার্ড খামার (রোমেল আশরাফ এভিয়ারি) গড়ে তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবী রোমেল আশরাফ। শখ থেকে শুরু হলেও এখন এটি তার জীবিকার প্রধান উৎস। খামার নিয়ে তার শখ, অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ, সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. ছাব্বির হোসাইন।
১. লাভ বার্ড খামার করার অনুপ্রেরণা কীভাবে পেলেন এবং শুরুটা কেমন ছিল?
রোমেল আশরাফ: ছোটবেলা থেকেই পাখির প্রতি ছিল আমার অদ্ভুত টান। তখন কবুতর পালন করতাম, আর ওদের সঙ্গে যেন এক বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়। আইনপেশায় ব্যস্ত থাকার সময়ও বাজরিগার, ঘুঘু আর কোকাটেল পালন করেছি । তবে শুধু শখেই থেমে থাকতে চাইনি। মনে হলো, এই ভালোবাসাকে আরও বড় কিছুতে রূপ দেওয়া যায়। তখনই লাভ বার্ড পালনের মাধ্যমে পাখি পালনকে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করি। কারণ এরা শুধু সুন্দরই নয়, বরং সহজে খাপ খাওয়াতে পারে, দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং নানা রঙে মানুষকে মুগ্ধ করে।
২. পরিবার ও কাছের মানুষরা তখন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?
রোমেল আশরাফ: যেহেতু আমি আইনপেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, পরিবারের কেউই বিষয়টা শুরুতে সহজভাবে নিতে পারেনি। তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে একজন যুবক যদি প্রতিষ্ঠিত পেশা ছেড়ে দিয়ে পাখি পালন শুরু করে, তবে তার ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে? সমাজে, বিশেষ করে পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে কীভাবে মুখ দেখাবে? সেই সময়টা আমার জন্য সত্যিই কঠিন ছিল। তবে আমি বিশ্বাস রেখেছিলাম নিজের সিদ্ধান্তে এবং ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও আশপাশের মানুষও বিষয়টা ইতিবাচকভাবে নিতে শুরু করে। এখন তারা শুধু স্বাভাবিকভাবেই নেয় না, বরং গর্ব করে আমার সাফল্যের কথা বলে এবং আন্তরিক শুভকামনা জানায়।
৩. বর্তমানে আপনার খামারের আকার, পাখির সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে পাঠকদের একটু জানাবেন?
রোমেল আশরাফ: প্রায় ১৮০০ স্কয়ারফিট জায়গাজুড়ে, নিজ বাসার তৃতীয় তলায় আমি গড়ে তুলেছি এভিয়ারিটি। এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর মেড্ডা এলাকায় অবস্থিত। খামারটি দেখতে গেলে মনে হবে যেন এক রঙিন পাখির রাজ্য। এখানে সবসময় প্রায় ১ হাজার লাভ বার্ড থাকে, যাদের কলরব ও উড়াউড়িতে এখানের পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত এ খামারে নতুন বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এবং সেগুলো বাজারজাতও হচ্ছে নিয়মিতভাবে। বছরে গড়ে প্রায় ১,৫০০ বাচ্চা উৎপাদন হয়, যা ক্রমশ আমার খামারকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
৪. আপনার খামার থেকে আর্থিকভাবে কতটা লাভ হচ্ছে?
রোমেল আশরাফ: নিঃসন্দেহে পাখি পালন একটি লাভজনক উদ্যোগ, তবে সেটি কেবল তখনই সম্ভব যখন এটি সঠিক নিয়মে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হয়। অনেকেই শখের বশে ১-২ জোড়া পাখি পালন শুরু করেন, কিন্তু এত কম সংখ্যায় কখনোই কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসে না। কারণ পরিমাণে কম হলে খামার ব্যবস্থাপনা, খাবার, ওষুধসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যায় এবং ব্যবসাটা টেকসই থাকে না। অন্যদিকে, যদি বড় পরিসরে পালন করা যায়, তাহলে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কমে আসে। একইসাথে বাজারে নিজের একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করাও সহজ হয়। এর ফলে শুধু নিয়মিত আয়ের পথই খোলে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিও গড়ে ওঠে।সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রচলিত ব্যবসার তুলনায় পাখির ব্যবসায় লাভের হার বা প্রফিট মার্জিন অনেক বেশি। আর এটি সম্পূর্ণ হালাল হওয়ায় যে কেউ নির্দ্বিধায় এই খাতকে পেশা হিসেবে নিতে পারে। ফলে পাখি পালন এখন শুধু শখ নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
৫. খামার পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মন করেন?
রোমেল আশরাফ: সঠিকভাবে পাখি পালন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লাভ বার্ড যতটা সুন্দর, ততটা যত্নের দাবিদার। যেহেতু এরা খাচার পাখি, প্রতিদিন নিয়মিত খাবার ও পানি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। এই মৌলিক দায়িত্বটি যদি ঠিকভাবে আয়ত্ব করা যায়, তবে খামার পরিচালনায় আর কোনো বড় বাধা থাকে না। তবে এর জন্য প্রয়োজন পাখির প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও সহানুভূতি। ধৈর্যও অপরিহার্য, কারণ প্রতিদিনের যত্ন ও পর্যবেক্ষণই পাখির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতা নির্ধারণ করে। এছাড়া খামারের সফলতার জন্য ভালো পাখি নির্বাচন করা এবং অভিজ্ঞ ব্রিডারের পরামর্শ অনুযায়ী খামার পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।
৬. যারা নতুন উদ্যোক্তা, লাভ বার্ড পালন শুরু করতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
রোমেল আশরাফ: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, দেখে শুনে এবং অভিজ্ঞতা যাচাই করে এমন ব্রিডার থেকে বাচ্চা পাখি সংগ্রহ করা, যারা কোয়ালিটি পাখি উৎপাদন করে এবং প্রয়োজনে সর্বদা সাহায্যের জন্য কাছে পাওয়া যায়। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিন এমন ব্রিডারদের প্রতি যারা পাখি পালন শেখান এবং যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ সম্ভব। সঠিকভাবে পালন পদ্ধতি ধৈর্যসহ শিখলে আর পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন হয় না। এতে আপনার খামার সফল হবে, পাখির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং ব্যবসা স্থিতিশীলভাবে চলবে।
৭. বাজারে লাভ বার্ডের চাহিদা কেমন? ক্রেতাদের মধ্যে কারা বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন?
রোমেল আশরাফ: বাজারে লাভ বার্ডের চাহিদা বর্তমানে অনেক বেশি। এ কারণে একে একমাত্র বানিজ্যিক পাখি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কারণ লাভ বার্ড শুধু দেখতে সুন্দরই নয়, বরং বিভিন্ন রঙের মিউটেশন হয়ে থাকে এবং ডিম ও বাচ্চা উৎপাদনে বিশেষ পারদর্শী। ছোট আকারের হওয়ায় অল্প জায়গায়ও সহজে পালন করা যায়, যা নগর বা আবাসিক এলাকায় অনেক সুবিধা দেয়। ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষ করে এমন মানুষরা এ পাখিকে পছন্দ করেন, যাদের পাখির প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা আছে। শিশু-কিশোররা এই পাখিকে বেশি আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে, কারণ এর রঙিন চেহারা ও মৃদু ডাক তাদের মুগ্ধ করে। এই সব কারণে লাভ বার্ড এখন শুধু শখ নয়, একটি জনপ্রিয় ও লাভজনক পোষ্য হিসেবে পরিচিত।
৮. খামার নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
রোমেল আশরাফ: আমি চাই প্রতিটি ঘরে অন্তত একটি পাখি থাকুক, হোক সেটা লাভ বার্ড বা বাজরিগার। কারণ আধুনিক নগরায়ণের যুগে এটি একমাত্র সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম, যা মানুষকে মোবাইল, ট্যাব বা অন্যান্য ক্ষতিকর নেশা থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। বাসার ছোট ভাই-বোন বা ছেলে-মেয়েকে মোবাইল ফোনের পরিবর্তে এক জোড়া পাখি উপহার দিলে, তারা খেলাধুলা ও প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকাবে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বিবেকবান হয়ে উঠবে, এটাই আমার বিশ্বাস। সৌখিন পাখি পালনটা যেন শিল্পে পরিণত হয়, যেন সর্বস্তরে ছড়িয়ে যায়, এটা নিয়েই কাজ করছি এবং করে যাবো। পাশাপাশি এটি বেকারত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে, দেশের বাইরে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও রয়েছে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই কারণে আমি এ কাজে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি এবং ভবিষ্যতেও চালিয়ে যাব।
- এক সময়ের নিছক শখ আজ হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার ডানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবী রোমেল আশরাফ একঘেয়েমি কাটাতে কয়েক জোড়া লাভবার্ড পালন শুরু করেছিলেন। রঙিন পালক আর মিষ্টি ডাকের পাখিরা ধীরে ধীরে তার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, সেখান থেকেই জন্ম নেয় তার স্বপ্নের খামার “Romel Ashraf Aviary”। ভালোবাসা, যত্ন আর ধৈর্যের ফলেই আজ সেটি দেশের অন্যতম বড় লাভবার্ড খামার। এখন এটি শুধু শখ নয়, বরং তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নানা জাতের দুর্লভ লাভবার্ড দিয়ে তিনি দেশের শৌখিন পাখিপ্রেমীদের চাহিদা মেটাচ্ছেন। শুরুতে অনেকে সন্দিহান হলেও তার সাফল্য প্রমাণ করেছে, নিষ্ঠা ও পরিকল্পনা থাকলে শখও ব্যবসায় রূপ নিতে পারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “শুধু ব্যবসা নয়, তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে চাই।” আইনজীবী থেকে সফল খামারি হওয়ার এই যাত্রা আজ অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
