পূজার দীর্ঘ ছুটিতে বিশ্বের তৃতীয় এবং হিমালয় পর্বতমালার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী টানে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের ঢল নেমেছে। কিন্তু সপ্তাহ খানেকের বেশি দিন ধরে মেঘের কোলে লুকিয়ে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।
শরতের শেষে এসে কয়েকদিনের জন্য দেখা দিয়ে আবারও মেঘের কোলে মুখ লুকিয়েছে লজ্জাবতী কাঞ্চনজঙ্ঘা। হেমন্তের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তার লজ্জা যেন কাটছেই না। সবার প্রত্যাশা, উত্তরের আকাশে আবারও উঁকি দেবে হিমালয়ের অপরূপ তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
সাপ্তাহিক ছুটিসহ ঈদের পর টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে পরিবার পরিজন নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়ার টানে অনেকেই ছুটে এসেছেন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হিমালয় কন্যাখ্যাত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে উত্তরের আকাশ মেঘে আবৃত্ত থাকার কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে গেছে আড়ালে, আবডালে। এরপরও প্রকৃতির টানে পর্যটকদের আগমন থেমে নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তেঁতুলিয়ায় এসে রাতে তারা অবস্থান করছেন আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক ডাকবাংলো এলাকায় জড়ো হচ্ছেন শত শত পর্যটক। উদ্দেশ্য একটাই, এক নজর নিজ চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন। কিন্তু না; আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের দেখা মিলছে না। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রিয় পর্বতকে না দেখার আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেক দর্শনার্থীকে।
অনেকে আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে না পেলেও ঘুরে দেখছেন সবুজে ঘেরা সমতলের চা বাগান, কেউ উপভোগ করছেন মহানন্দা নদীর সৌন্দর্য। আবার কেউ মুগ্ধ হচ্ছেন সীমান্তঘেঁষা জনপদের নির্মল পরিবেশে। দর্শনার্থীদের কারও হাতে ক্যামেরা, কারও হাতে মুঠোফোন। উত্তরের আকাশে মেঘের সামান্য ফাঁক দেখা দিলেই ছবি তোলার প্রস্তুতিও রয়েছে তাদের।
রাজধানী ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক রুপম ও নীলফামারী থেকে আসা আতিক ওয়াদুদ জানান, পুজোর দীর্ঘ ছুটিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় তারা পঞ্চগড়ে এসেছেন। কিন্তু উত্তরের শান্ত আকাশ মেঘে ঢাকা থাকায় তাদের আশা পুরণ হয়নি। কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না পেলেও তেঁতুলিয়ার শান্ত পরিবেশ, রাতের ডাকবাংলো এলাকার সৌন্দর্য এবং মহানন্দা নদীর মনোরম দৃশ্য তাদের ভালো লেগেছে। বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, বিস্তীর্ণ সমতলের চা-বাগান, মহানন্দা নদী, আনন্দধারা, বড়বিল্লাহ এবং সীমান্তবর্তী ঐতিহ্যবাহী গ্রাম দর্জিপাড়া, কাজীপাড়া ও শারিয়ালজোত। ফেরার পথে তারা দেখেছেন পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়াম, ঐতিহাসিক মহারাজার দিঘি, আটোয়ারীর মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বোদার বোদেশ্বরী মন্দির।
আবার তেঁতুলিয়ায় দ্বিতীয় সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা না গেলেও প্রতিদিন হাজারও পর্যটকদের উপস্থিতিতে তেঁতুলিয়ার পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরেছে। হোটেল, রিসোর্ট ও হোমস্টেগুলোতে থাকার জায়গা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে অনেক দর্শনার্থীকে। পাশাপাশি খাবারের হোটেল, চায়ের দোকান এবং স্থানীয় পরিবহনসেবায় বেড়েছে ব্যস্ততা। পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যেতে অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদেরও ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। পর্যটনকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে মেঘ ও কুয়াশার উপস্থিতির কারণে পর্বতশৃঙ্গটি দৃশ্যমান হচ্ছে না। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিচে কুয়াশা থাকলে উপরের মেঘ সরে দিনের কিছুটা সময়ের জন্য দৃশ্যমান হতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘা। আবহাওয়ার আদোপান্ত খবর নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসার জন্য তিনি পর্যটকদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এদিকে পর্যটন মৌসুমে আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন জানান, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ও হয়রানি প্রতিরোধে রিসোর্ট ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
