প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বাস্তব ছবি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবির পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আধুনিক ইমেজ জেনারেটর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুগল ইমেজ সার্চ, পিন্টারেস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনেও বাড়ছে এ ধরনের ছবির ব্যবহার। একই সঙ্গে বেড়েছে নিম্নমানের ও অতিরিক্ত এআই-নির্ভর কনটেন্টের বিস্তার, যা ‘এআই স্লপ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
তাই অনলাইনে কোনো ছবি দেখেই সেটিকে বাস্তব বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ছবির কিছু বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত টুল ব্যবহার করে এআই-তৈরি ছবি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
১. ছবির লেখায় অস্বাভাবিকতা খুঁজুন
এআই-তৈরি ছবি শনাক্তের সহজ উপায়গুলোর একটি হলো ছবির ভেতরে থাকা লেখা পরীক্ষা করা। পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, সাইনবোর্ড, টি-শার্ট কিংবা বিজ্ঞাপনের লেখাগুলো বিকৃত, অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা অর্থহীন হলে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
আধুনিক এআই আগের তুলনায় অনেক ভালোভাবে লেখা তৈরি করতে পারলেও কিছু ক্ষেত্রে অক্ষর, শব্দ বা বাক্যে ভুল থেকে যেতে পারে। তাই সন্দেহজনক ছবির লেখা জুম করে দেখা যেতে পারে। তবে লেখায় ভুল থাকলেই ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
২. হাত ও শরীরের গঠন খেয়াল করুন
মানুষের হাত ও আঙুলের গঠন এআই-তৈরি ছবিতে কখনো কখনো অস্বাভাবিক হতে পারে। অতিরিক্ত বা জোড়া লেগে থাকা আঙুল, বিকৃত নখ কিংবা অস্বাভাবিক গাঁট এমন ছবির সম্ভাব্য লক্ষণ।
এ ছাড়া কবজি, কনুই, ঘাড়, পা এবং শরীরের অন্যান্য অংশের অনুপাতও খেয়াল করা জরুরি। চোখ, নাক ও দাঁতের গঠনে অসংগতি থাকলেও ছবিটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তবে ছবির মান কম হলে বা সম্পাদনার কারণে বাস্তব ছবিতেও এ ধরনের অসংগতি দেখা দিতে পারে।
৩. অতিরিক্ত নিখুঁত চেহারা
এআই দিয়ে তৈরি অনেক ছবিতে মানুষের ত্বক, চোখ, চুল ও দাঁত অস্বাভাবিক রকম নিখুঁত দেখায়। ত্বক অতিরিক্ত মসৃণ, চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল কিংবা চুলের বিন্যাস খুব বেশি পরিপাটি মনে হতে পারে।
ছবির ব্যক্তিকে বাস্তবের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত মনে হলে সেটি আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। তবে সৌন্দর্যবর্ধক ফিল্টার ও ছবি সম্পাদনার কারণেও বাস্তব মানুষের চেহারা এমন দেখাতে পারে।
৪. খাবার ও পণ্যের ছবিতে অস্বাভাবিক নিখুঁততা
খাবার, প্রসাধনী ও বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে এআই-তৈরি ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ছবিতে খাবারের রং, গঠন, আলো ও বিন্যাস অনেক সময় অতিরিক্ত নিখুঁত দেখায়। বাস্তবের স্বাভাবিক দাগ, ছোপ বা অসম্পূর্ণতা অনুপস্থিত থাকতে পারে।
আলো-ছায়া, খাবারের গঠন, পণ্যের প্রান্ত এবং আশপাশের বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করলে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়তে পারে। তবে পেশাদার ফটোগ্রাফি ও সম্পাদনার মাধ্যমেও পণ্যের ছবি অত্যন্ত নিখুঁত করা সম্ভব।
৫. পটভূমি, ছায়া ও প্রতিফলনে অসংগতি দেখুন
এআই-তৈরি ছবিতে কখনো কখনো পটভূমির নকশা, বস্তুর অবস্থান, ছায়া কিংবা প্রতিফলনে অসংগতি দেখা যায়। কোনো বস্তুর ছায়া আলোর উৎসের সঙ্গে না মেলা, আয়নায় প্রতিফলিত দৃশ্যের সঙ্গে মূল দৃশ্যের পার্থক্য কিংবা পটভূমিতে অস্বাভাবিক আকৃতি এমন ছবির সম্ভাব্য লক্ষণ।
কিছু ছবিতে অপ্রয়োজনীয় উপাদান বা অতিরিক্ত নাটকীয় বিবরণও দেখা যায়। পুরো ছবির বদলে এর বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এসব অসংগতি সহজে চোখে পড়তে পারে।
৬. সূক্ষ্ম বিবরণ পরীক্ষা করুন
এআই দিয়ে ছবি তৈরি, পুরোনো ছবি রঙিন করা কিংবা ছবির মান উন্নত করার সময় কিছু সূক্ষ্ম বিবরণ বদলে যেতে পারে। ভবনের ইটের গাঁথুনি, গাছের পাতার গঠন, পোশাকের নকশা কিংবা চুলের গোছায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
ছবির কোনো অংশ বাস্তব আলোকচিত্রের বদলে আঁকা বা কৃত্রিমভাবে তৈরি বলে মনে হলে সেটি আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছবির ছোট ছোট অংশ বড় করে দেখলে কিছু অসংগতি ধরা পড়তে পারে।
প্রযুক্তির সাহায্যেও যাচাই করা যায়
শুধু চোখের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত টুল ব্যবহার করেও ছবির উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা যায়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ‘সার্কেল টু সার্চ’ এবং গুগল লেন্সের ‘অ্যাবাউট দিস ইমেজ’ ফিচারের মাধ্যমে ছবিটি আগে কোথায় প্রকাশিত হয়েছে বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া গুগলের জেমিনি অ্যাপে ছবি আপলোড করে সেটির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে বলা যায়। তবে এআইয়ের দেওয়া উত্তরকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। গুগলের ‘SynthID’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিহ্নিত কিছু এআই-তৈরি ছবি বা কনটেন্ট শনাক্ত করতেও নির্দিষ্ট টুল সহায়তা করতে পারে। তবে সব এআই-তৈরি ছবিতে এ ধরনের শনাক্তযোগ্য চিহ্ন থাকে না।
এআই ডিটেক্টর কি শতভাগ নির্ভরযোগ্য?
এআই-তৈরি ছবি শনাক্ত করার কোনো ডিটেক্টরই শতভাগ নির্ভুল নয়। কখনো এআই দিয়ে তৈরি ছবিকে বাস্তব ছবি হিসেবে শনাক্ত করা হতে পারে, আবার বাস্তব ছবিকেও ভুলভাবে এআই-তৈরি বলে চিহ্নিত করা হতে পারে। ছবি সম্পাদনা, কমপ্রেশন বা অন্য ফরম্যাটে রূপান্তরের কারণেও শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে যেতে পারে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো ছবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ডিটেক্টরের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে ছবির মূল উৎস, প্রকাশের সময়, প্রেক্ষাপট এবং দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে সংবাদ, ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছবি প্রকাশের আগে মূল উৎস যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
এমএস/
