একসময় পাড়া-মহল্লায় মনিপুরী তাঁত বুনতে শৈল্পিক কারিগরদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁত মেশিনের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
আগের মতো তাঁত মেশিনের খটখট শব্দ আর শোনা যায় না। তাঁতে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে গ্রামীণ হাট-বাজারে মনিপুরীদের আনাগোনাও কমে গেছে।
একসময় মনিপুরী তাঁতে শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদরসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি হতো।
এসব পণ্য স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি বিদেশেও পাঠানো হতো।
দূর-দূরান্ত থেকে পাইকার ও দেশের বিভিন্ন বায়িং হাউসের প্রতিনিধিরা মনিপুরী পাড়ায় এসে এসব পণ্য কিনতেন। বর্তমানে সেই ব্যস্ততাও অনেকটাই হারিয়ে গেছে। অধিকাংশ মনিপুরী তাঁতশিল্পী তাঁতপল্লীর কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সর্ববৃহৎ কর্মধা ইউনিয়নের ফটিগুলি, ভান্ডারীগাঁও ও নলডরী এবং পাশের জুড়ী উপজেলার পূর্বজুড়ী ইউনিয়নের ছোট ধামাই এলাকায় প্রায় দুই সহস্রাধিক মনিপুরী নারী, পুরুষ ও শিশু বসবাস করেন। প্রায় আড়াই যুগ আগেও এসব এলাকায় পাঁচ শতাধিক তাঁতপল্লী চালু ছিল। অধিকাংশ মনিপুরী নারী-পুরুষ তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তখন কাঠের তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা। তৈরি হতো শত শত শাড়ি, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর।
স্থানীয় মনিপুরী সম্প্রদায়ের নিলয় সিং, তপন কুমার সিং, রঞ্জিতা দেবী, সুমি দেবী, শান্তা দেবী, কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের ভান্ডারীগাঁও গ্রামের মনিপুরী স্কুলশিক্ষিকা পুস্পিতা ও শিউলী দেবী এবং ব্যবসায়ী রাজেস সিং জানান, বর্তমানে তারা নিজেদের ও আত্মীয়-স্বজনের ব্যবহারের জন্য ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী মেয়েদের পোশাক, ওড়না ও গামছা তৈরি করছেন। তাঁরা জানান, সনাতনী পদ্ধতিতে রঙিন একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে। এক কেজি সুতা দিয়ে তিনটি শাড়ি তৈরি করা যায়। একটি তাঁত মেশিনে সাত-আটটি শাড়ি তৈরির জন্য একসঙ্গে সুতা প্রসেসিং করা যায়। আটটি শাড়ির সুতা প্রসেসিং করতে সময় লাগে চার-পাঁচ দিন।
স্থানীয় তাঁতশিল্পীদের মতে, মজুরিসহ একটি শাড়ি তৈরি করতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ক্রেতাদের সঙ্গে দরদাম করে তা বিক্রি করতে হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। এর মধ্যে সুতার দাম, রং, বিদ্যুৎ বিল, শ্রম ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে লাভ থাকে খুবই সামান্য। ফলে তাঁতশিল্পীদের কাছে এ পেশা দিন দিন অলাভজনক হয়ে উঠছে। শুধু শাড়ি নয়, গামছা, লুঙ্গি, ওড়না, মাছ ধরার জাল ও বিছানার চাদর তৈরিতেও খরচ অনেক। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় এসব পণ্য তৈরি অনেক জায়গায় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মনিপুরী সম্প্রদায়ের অনেকেই বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি চাকরি, কৃষিকাজ ও অন্যান্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। ফলে বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী তাঁত শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
ভান্ডারীগাঁও গ্রামের সরকারি চাকরিজীবী প্রদীপ সিং বলেন, ‘আমাদের মনিপুরী তাঁত শিল্প এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। আড়াই যুগ আগেও মনিপুরী পোশাকের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মনিপুরী তাঁত আমাদের ঐতিহ্য। যুগের পর যুগ আমাদের পূর্বপুরুষরা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মনিপুরী তাঁতের কাপড় বুনেই আমাদের বাপ-দাদা, চাচা-মামাদের সংসার চলত। এখন এই পেশা ছেড়ে আমরা অন্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছি।’
ফটিগুলি গ্রামের জিহারি সিংহ, নলডরী গ্রামের দিলীপ কুমার সিংহ, ভান্ডারীগাঁও গ্রামের সুরঞ্জিত সিংহ ও গৌর চন্দ্র সিংহ বলেন, ‘কুলাউড়ার মনিপুরী তাঁত শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো সময় আছে। সরকার ও উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে ঐতিহ্যবাহী মনিপুরী তাঁত শিল্প আবারও আলোর মুখ দেখতে পারে।’
মনিপুরী তাঁতশিল্পীদের দাবি, সুতার দাম নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণে সহযোগিতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।#
