চলছে বিক্ষোভছবি: ANI
Published on
:
3 min read
এই সময়: ফ্রান্সে পড়ুয়াদের বিক্ষোভ আর ভারতে জেন জ়ি–র প্রতিবাদ— দুটোর পিছনেই কি একই বিদেশি শক্তির মদত? সম্প্রতি 'ফক্স নিউজ়'–এর তদন্তমূলক রিপোর্টে উঠে আসা এই যোগসূত্র নিয়েই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সুর চড়াল বিজেপি। সেই সঙ্গে ভারতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)–র বিক্ষোভের পিছনে বিদেশি ফান্ডিং নিয়েও নতুন করে উঠল প্রশ্ন।
'হাত' শিবিরের অবশ্য দাবি, নির্বাচনী কারচুপি থেকে নজর ঘোরাতেই 'মিথ্যে ছড়াচ্ছে' পদ্ম শিবির। ফক্স নিউজ়ের তদন্তমূলক রিপোর্ট বলছে, ফ্রান্সে স্কুল পরিকাঠামোর দুরবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ যে দাঙ্গার রূপ নিয়েছে, তার সঙ্গে ভারতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ঘিরে বিক্ষোভের যোগসূত্র রয়েছে। তদন্ত রিপোর্টে ১৩টি দেশের ১০১টি সংগঠনকে শনাক্ত করেছে ফক্স নিউজ়, যারা ফ্রান্স–সহ বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ, অশান্তি ছড়িয়ে নির্বাচিত সরকার ফেলার চেষ্টা করছে!
এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করেই বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপি মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া বলেন, 'বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী দেশের সামনে নৈরাজ্য ও গদ্দারির মডেল তুলে ধরছেন। সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্ট দেখিয়েছে, রাহুলের এই বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে বিদেশি এজেন্সিগুলো কী ভাবে যুক্ত! বোঝাই যাচ্ছে, রাহুল গদ্দার! ভারতের বিরোধী দলনেতা চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনভিজ্ঞ, এটাই দেশের দুর্ভাগ্য।
আজকে যখন তাঁর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি, তাঁকে বিশ্বাসঘাতক বা মীরজ়াফর বলাটা আর অন্যায় নয়!' ফক্স নিউজ়ের তদন্ত রিপোর্ট তুলে ধরে ভাটিয়ার দাবি, এই ১০১টি অর্গানাইজ়েশন সারা বিশ্বে সরকার ফেলার 'লাল–সবুজ ইকো–সিস্টেম' চালাচ্ছে। লাল অর্থাৎ 'কমিউনিস্ট গ্রুপ' এবং সবুজ অর্থে 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্ট গ্রুপস'। বিজেপি মুখপাত্রের স্পষ্ট বক্তব্য, 'কেউ ছাড় পাবে না। ভারত–বিরোধী শক্তি ধ্বংস হবেই, কারণ ভারতে শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রয়েছেন।'
ফক্স নিউেজ়র রিপোর্টে ফ্রান্স–বেসড অর্গানাইজ়েশন 'ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস' (আইএপি)–এর নাম রয়েছে। অভিযোগ, ফ্রান্স এবং ভারতের যুব–বিক্ষোভের সমর্থনে একাধিক পোস্ট শেয়ার করেছিল তারা। ম্যানহাটানের 'পিপলস ফোরাম' এবং 'প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল'–এর মতো 'ভারত–বিরোধী' গ্রুপের সঙ্গে আইএপি–র যোগ মিলেছে। এ দিকে, গত বছর ১০ এপ্রিল 'প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল'–এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল এবং সনিয়া গান্ধীর সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করেছে বিজেপি। দলের মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারীর বক্তব্য, 'প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল–এর মতো অর্গানাইজ়েশনের উদ্দেশ্যই হলো সংগঠিত বিপ্লব তৈরি করে সরকার ফেলে দেওয়া। এদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই ১০ জনপথে দেখা করেছিলেন রাহুল ও সনিয়া গান্ধী। এতেই প্রমাণিত, রাহুল গান্ধী এবং তাঁর দল বিদেশি গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির রিমোট কন্ট্রোলে চলে! ভারতে যখন সরকার বিরোধী প্রতিবাদ চলছে তখন প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল–এর মতো অর্গানাইজ়েশনের সঙ্গে কংগ্রেসের কী বার্তা চালাচালি হয়েছিল? ওই প্রতিষ্ঠানের নির্দেশেই কি রাহুলের ভিয়েতনাম সফর? কংগ্রেসকে জবাব দিতেই হবে।' ভাণ্ডারীর দাবি, দিল্লির প্রতিবাদস্থল থেকে রাহুল গান্ধী যখন আটক হন, 'ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস' প্রথম সেই ভিডিয়ো শেয়ার করেছিল। রাহুলের সমর্থনে অনলাইন প্রচার চালিয়েছিল তারা। তা হলে কি বিদেশি ফান্ডিংয়ের জোরেই ভারতে এই বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছে? প্রশ্ন ভাণ্ডারীর। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে সরব বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেও। তাঁর দাবি, ভারত–বিদ্বেষী মার্কিন আইনসভার সদস্য ইলহান ওমর এবং রো খান্নার সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে রাহুলের। দুবের অভিযোগ, 'কংগ্রেস বিদেশি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুধু সরকার ফেলতে চাইছে না, দেশটাকে ভাঙতে চাইছে। সোরোস ফাউন্ডেশনের আড়ালে ওমর এবং রো খান্নার সঙ্গে দেখা করেছিলেন রাহুল। তাঁদের সঙ্গে কীসের যোগ? স্পষ্ট করুক তাঁর দল।'
কংগ্রেস অবশ্য ফক্স নিউেজ়র রিপোর্টকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশের সাফ বক্তব্য, 'ভারতের শাসক দল এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটচুরির প্রমাণ মিলেছে। পুরো দেশ বিষয়টা নিয়ে ক্ষুব্ধ। চাপের মুখে নার্ভাস হয়েই নজর ঘোরানোর চেষ্টা করছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। মিথ্যে ছড়ানো বিজেপির ডিএনএ–তে রয়েছে, তবে এই প্রচেষ্টা সফল হবে না।'
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, নাগপুরে বিজয়া দশমীর অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকেও বিদেশি 'অশুভ শক্তি' নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শোনা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, 'পশ্চিম থেকে আসা একটা ঝড় সব সিস্টেম, শুভ শক্তি, সংস্কৃতি, সংস্কারকে ভেঙে, ধ্বংস করে দিতে চাইছে। সেই ঝড়ের প্রভাবেই ফ্রান্সে, আলবানিয়ায়, বাংলাদেশে, নেপালে কী ঘটছে দেখুন! ভারতের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র চলছে। তবে ভারতের নীতি, যুবসমাজের সচেতনতা এই আসুরিক শক্তিকে জিততে দেবে না!' একই সুরে মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর অনুষ্ঠান থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তা, 'যে অশুভ শক্তি দেশের সম্মান নষ্ট করতে চায়, সমাজে বিভাজন ঘটায়, আমাদের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, তারা দেশের শত্রু। সেই শত্রুদের হারানোই আমাদের লক্ষ্য।' বৃহস্পতিবার মিডিয়ার এক অনুষ্ঠানেও মোদীকে বলতে শোনা যায়, 'পুরো বিশ্ব যখন নতুন দিশা খুঁজছে, কিছু লোক ভারতকে দিশাহীন করার স্বপ্ন দেখছে। এরা বিদেশে গিয়ে দেশের সম্মান ধূলিসাৎ করছে, বিদেশিদের হস্তক্ষেপ চাইছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।' এ ব্যাপারে প্রতিবাদী যুবসমাজকে অবশ্য কাঠগড়ায় তোলেননি মোদী। তাঁর দাবি, 'সরকারের খামতি তুলে ধরতে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হবে, তার মাধ্যমেই সংস্কার ঘটবে— গণতন্ত্রে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কংগ্রেস এই প্রতিবাদগুলোকেও ধ্বংস করছে। কংগ্রেস আদতে পরজীবী, ওরা সকলকে ধ্বংস করে।' রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেন জ়ি ভোটারদের কথা মাথায় রেখেই আক্রমণের ধার শুধুমাত্র কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই শাণিয়েছেন মোদী।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)–র নেতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা তাঁদের হেফাজতের মেয়াদ বৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে বুধবার দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, সেই শুনানিতেও উঠেছে ফ্রান্সের প্রসঙ্গ! সিজেপি নেতারা যন্তর মন্তরে আচমকা ঢুকে পড়েছিলেন বলে অভিযোগ। হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রহ্মণ্যম প্রসাদের বক্তব্য, 'বিক্ষোভের নেতৃত্বে থাকা আপনারা যদি ব্যারিকেড ভেঙে ভিতরে ঢোকেন, অন্যরাও আপনাদের অনুসরণ করবে। ভিড়টা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কী হতো? দেশের বাইরে কী ঘটছে দেখেছেন? ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়ে দাঙ্গা, বাড়ি পোড়ানো— কী না হচ্ছে! এখানেও ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবেই ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল, কিন্তু আপনারা তো কেউ ছাত্র বা জেন জ়ি নন! আপনারা কেন এই বিক্ষোভে জড়াচ্ছেন?' পরে অবশ্য দিল্লির স্পেশাল এগজ়িকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে জামিন পান দুই সিজেপি নেতা।