নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে বাঙালির যোগাযোগ তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রথম নোবেল পান তিনি। এরপর একে একে অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করেন। ভারতের প্রথম নারী নোবেল লরিয়েটও হতে পারতেন এক বাঙালি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেটি হয়নি।
বিখ্যাত কোয়ান্টাম পদার্থবিদ এরউইন শ্রোডিঙ্গার ১৯৫০ সালের নোবেল পুরস্কারের জন্য ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী বিভা চৌধুরী এবং তাঁর সহ-গবেষক ডি এম বসু বা দেবেন্দ্রমোহন বসুকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। পাই-মেসন বা পায়ন নামক উপ-পারমাণবিক কণা আবিষ্কার এবং মহাজাগতিক রশ্মিসংক্রান্ত যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে শ্রোডিঙ্গার এই মনোনয়ন দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সে বছর নোবেল পুরস্কারটি পান ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সি এফ পাওয়েল।
তবে এই মনোনয়নের পরও বিশেষজ্ঞমহলের বাইরে খুব বেশি পরিচিতি পাননি বিভা চৌধুরী। অথচ তাঁর কণা পদার্থবিদ্যা ও মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। অবশ্য মৃত্যুর পর এখন তাঁকে ভারতীয় কণা পদার্থবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ নারী হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে।
বিরুদ্ধ সময়ে যাত্রা
‘নারীরা পদার্থবিদ্যাকে ভয় পান—এটাই সমস্যা। আজ আমাদের নারী পদার্থবিদের সংখ্যা এত কম, এটা দুঃখজনক।’ ১৯৪৮ সালে ‘ম্যানচেস্টার হেরাল্ড’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছিলেন পদার্থবিদ বিভা চৌধুরী। কথাটি কেবল বিশ শতকের সমাজচিত্র নয়, তাঁর নিজের সংগ্রামময় জীবনের প্রতিচ্ছবিও বটে। যে সময়ে অবিভক্ত ভারতে নারী শিক্ষার বিষয়টিই ছিল বিরল ব্যাপার, সেই সময় তিনি পদার্থবিদ্যার গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
১৯১৩ সালে কলকাতায় একটি শিক্ষিত ও প্রগতিশীল বাঙালি পরিবারে জন্ম বিভা চৌধুরীর। তাঁর বাবা বঙ্কু বিহারি চৌধুরী ছিলেন চিকিৎসক। মা ঊর্মিলা দেবী ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবার থেকে আসা।
শৈশবেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় বিভার। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁর বাবা তাঁকে জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণার কথা বলেছিলেন। ঘটনাটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
বেথুন স্কুলে পড়াশোনা শেষে স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্থবিদ্যায় পড়েন বিভা। এরপর ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে বিষয়েই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। তাঁর ব্যাচে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী শিক্ষার্থী।
স্নাতকোত্তর শেষ করার পর পদার্থবিদ দেবেন্দ্রমোহন বসুর অধীনে গবেষণার চেষ্টা করেন বিভা। কিন্তু বসুর ধারণা ছিল, পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে নারীদের তেমন কোনো কাজ নেই। তবে বিভা নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দেবেন্দ্রমোহন বসুর গবেষণাদলে যোগ দেন।
তখন মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা ছিল পদার্থবিদ্যার একটি উদীয়মান ক্ষেত্র। আধুনিক কণা ত্বরক যন্ত্র না থাকায় বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক রশ্মির মাধ্যমে অত্যন্ত উচ্চশক্তির কণার প্রাকৃতিক উৎস পেতেন। ফটোগ্রাফিক নিউক্লিয়ার ইমালশন প্লেটে এসব কণার গতিপথ ধারণ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হতো।

দেবেন্দ্রমোহন বসু ও বিভা হিমালয়ের বিভিন্ন উঁচু এলাকা, দার্জিলিং ও সান্দাকফুতে গবেষণা চালান। দীর্ঘ সময় ধরে প্লেটে তথ্য ধারণের পর মাইক্রোস্কোপে ক্ষুদ্র কণার গতিপথ পরীক্ষা করতে হতো। কাজটি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ধৈর্যের।
ত্রিশের দশকের শেষ ও চল্লিশের দশকের শুরুতে বসু ও বিভা ‘নেচার’ সাময়িকীতে মেসোট্রন শাওয়ার এবং মেসোট্রনের ভর নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। মেসোট্রন বর্তমানে মিউয়ন নামে পরিচিত কণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে বিভা ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি পদার্থবিদ প্যাট্রিক এম ব্ল্যাকেটের মহাজাগতিক রশ্মি গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। ব্ল্যাকেট ১৯৪৮ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান।
ম্যানচেস্টারে বিভা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি বৃহৎ এয়ার শাওয়ার নিয়ে ডক্টরাল গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মহাজাগতিক রশ্মি গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।
তবে বৈজ্ঞানিক পরিচিতি বাড়লেও বিভার পেশাজীবন সহজ ছিল না। যুদ্ধ, সীমিত গবেষণা অবকাঠামো এবং গবেষণায় নারীদের জন্য অল্প সুযোগের মধ্যেই তাঁকে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়। গবেষণার কাজে এতটাই বুঁদ ছিলেন যে তিনি বিয়ে না করে শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রিক জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
১৯৪৯ সালে ভারতে ফিরে বিভা টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে (টিআইএফআর) যোগ দেন। হোমি জে ভাবা (হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা) তাঁকে নির্বাচিত করেন। টিআইএফআরের প্রথম নারী ফ্যাকাল্টি সদস্য ছিলেন তিনি।
১৯৫৩ সালে টিআইএফআর ছেড়ে দিয়ে বিভা প্যারিসের সেন্টার ন্যাশনাল দ্য লা রিশের্শ সায়েন্টিফিকের মহাজাগতিক রশ্মি গবেষক এল লেপ্রাঁস-রিঙ্গের গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। আল্পস পর্বতে ক্লাউড চেম্বার ব্যবহার করে তিনি কয়েকটি নতুন কে-মেসন শনাক্ত করেন। ১৯৫৭ সালে ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞান সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইল নুওভো চিমেন্তো’ সাময়িকীতে তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়। এ সময় মার্কিন পদার্থবিদ ওয়েন হ্যাজেনের সঙ্গেও কাজ করেন তিনি। হ্যাজেন তাঁকে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে পড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
১৯৫৭ সালে ভারতে ফিরে বিভা আহমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে (পিআরএল) যোগ দেন। সেখানে তিনি বিক্রম সারাভাইয়ের অধীনে কাজ করেন।
এরপর এক সাবেক সহকর্মীর সঙ্গে আবার যোগাযোগের সূত্রে কর্ণাটকের কোলার গোল্ড ফিল্ডসে টিআইএফআরের লার্জ শাওয়ার অ্যারে ব্যবহার করে উচ্চশক্তির মিউয়ন মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। মিউয়ন ডিটেক্টর ও প্লাস্টিক সিন্টিলেটর ব্যবহার করে তিনি বিপুলসংখ্যক ঘটনা শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করেন এবং সেগুলোর সংঘটনের সম্ভাবনা পরিমাপ করেন। গবেষণাটি কয়েক বছর ধরে চলার পর ১৯৭৬ সালে শেষ হয়। এরপর পিআরএল থেকে অবসর নেন বিভা।
গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, স্বীকৃতি নেই
বিভা চৌধুরীর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর গবেষণার গুরুত্বের সঙ্গে জীবদ্দশায় পাওয়া স্বীকৃতির বড় ব্যবধান।
দেবেন্দ্রমোহন বসুর সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক গবেষণা পরবর্তী সময়ে মেসন নিয়ে গবেষণার ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। একই ধরনের ফটোগ্রাফিক ইমালশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরে সিসিল ফ্রাঙ্ক পাওয়েল ১৯৫০ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। অবশ্য পাওয়েল বসু ও বিভার অবদানের কথা স্বীকার করেছিলেন। এ বছরই পদার্থবিদ শ্রোডিঙ্গার বিভা ও বসুকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেন।
নোবেলের মতো ভারতের কোনো পুরস্কার বা সম্মাননাও পাননি বিভা, নির্বাচিত হননি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবেও। কিন্তু গবেষণা থেমে থাকেনি। তাঁর শেষ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। আর ১৯৯১ সালের ২ জুন কলকাতায় ৭৭ বছর বয়সে মারা যান বিভা চৌধুরী।
মৃত্যুর পর স্বীকৃতি
জীবদ্দশায় না পেলেও বিভা তাঁর অবদানের স্বীকৃতি পান মৃত্যুর পর। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন দূরবর্তী নক্ষত্র এইচডি ৮৬০৮১-এর নাম রাখে ‘বিভা’। বিভা শব্দের অর্থ আলোর রশ্মি। বিজ্ঞানের জগতে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা এক নারী বিজ্ঞানীর জন্য নামটি প্রতীকীভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালে ভারত সরকার বিভা চৌধুরীর নামে একটি চেয়ার প্রফেসরশিপ চালুর ঘোষণা দেয়।
বহু বছর আড়ালে থাকা এই বিজ্ঞানীর গবেষণাকর্ম এখন ধীরে ধীরে ভারতীয় বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর প্রাপ্য জায়গা ফিরে পাচ্ছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ‘বিভা চৌধুরী—দ্য ফার্স্ট ওম্যান সায়েন্টিস্ট অ্যাট দ্য টিআইএফআর’, টিআইএফআর ডট আরইএস ডট ইন
