বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২১ লাখ।
বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২১ লাখ। এ নিয়ে গত চার বছরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৮০ লাখ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দরিদ্র মানুষ বৃদ্ধি পেয়েছে ২০২৪ সালে যার সংখ্যা ছিল ৩৭ লাখ। একজন মানুষ দৈনিক গড়ে ২১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার ক্রয় এবং খাদ্য বহির্ভুত ব্যয় মেটানোর জন্য যে পরিমাণ আয় করা প্রয়োজন তা না করতে পারলে সেই অবস্থাকে দরিদ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার ঠিক ওপরে বসবাস করছে। সামান্য অভিঘাতেই তারা দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যেতে পারে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সে সময় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিল দরিদ্র। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তীতে দারিদ্র্য পরিস্থিতি উন্নতি হতে থাকে যদিও তার গতি ছিল অত্যন্ত মন্থর। ২০০১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশই ছিল দারিদ্র্য সীমার নিচে। পরবর্তী দু’দশকে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। বর্তমানে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (পিপিআরসিও) এর মতে, ২০২৫ সাল দেশে দরিদ্র মানুষে হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির জন্য প্রধানত দু’টি কারণকে দায়ী করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে গত সাড়ে ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে কর্মমুখি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করতে না পারা। গত সাড়ে ৪ বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার গড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরোপের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে যা, কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার পর বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার বিগত ৪০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সে সময় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা বারবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে এবং অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট আগে ছিল ৫ শতাংশ। এক পর্যায়ে তা বাড়াতে বাড়াতে ১০ শতাংশ করা হয়। বর্তমানে পলিসি রেট সাড়ে ৯শতাংশ। পলিসি রেট বাড়িয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য প্রদর্শন করেছে শ্রীলঙ্কা। আন্তর্জাতিকভাবে ঋণ খেলাপি হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি এক পর্যায়ে ৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সেখান থেকে পলিসি রেট বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দেশটি তাদের অর্থনীতিতে বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ৬ শতাংশে নিচে নামিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। তবে এই কর্মসংস্থান সাধারণ চাকরির মাধ্যমে হলে হবে না। কর্মসংস্থান হতে হবে আত্মকর্মসংস্থানমূলক। একজন আত্মকর্মসংস্থানকারি সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে বিপর্যস্ত হন না। পৃথিবীতে যেসবদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তাদের কারিগরি শিক্ষার হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। আর বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার হচ্ছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ যদি দ্রুত উন্নতি অর্জন করতে চায় এবং মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবেলা করতে চায় তাহলে কারিগরি শিক্ষার হার অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
