দেবহাটায় শামীম হত্যা
আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা, গ্রেপ্তার ২
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছে তাঁর পরিবার। বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় দায়ের করা মামলায় ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো গ্রেপ্তার হননি।
নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল মামলাটির বাদী। তিনি অভিযোগ করেছেন, মামলা দায়ের না করতে তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। নিহতের ছোট ভাই তাহসিভ রহমান সাগরের দাবি, মামলা করার পর তাঁদের পরিবার নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি শামীমের হত্যার ঘটনা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে তাঁদের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে হামলার অভিযোগ
মামলার এজাহার ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেবহাটার বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। মহানবীকে কটূক্তি করার অভিযোগে তাঁর একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত সোমবার সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, জামায়াত কার্যালয়ের সামনে থেকে বের হয়ে কিছু জামায়াত-সমর্থকসহ ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল শামীমের বাড়িতে গিয়ে কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে মারধর করে। একপর্যায়ে তিনি বিষপান করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাঁকে কুলিয়া বাজারের ডা. এম এ সবুরের ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
ক্লিনিক থেকে তুলে মারধরের অভিযোগ
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দক্ষিণ পারুলিয়ার রুহুল আমিনের ছেলে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদিকুল ইসলামসহ শতাধিক ব্যক্তি ক্লিনিকটি ঘেরাও করেন। তাঁরা চিকিৎসককে শামীমের চিকিৎসা বন্ধ করতে বলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর শামীমকে মারধর করে ক্লিনিকের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরার সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
হাসপাতাল ঘেরাও করে ফের হামলার অভিযোগ
এজাহার অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে কয়েক শ লোক মিছিল নিয়ে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘেরাও করে। তারা হাসপাতালের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নেয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে এবং একটি দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে প্রবেশ করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলাকারীরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জিম্মি করে চিকিৎসা বন্ধ করতে এবং শামীমকে তাদের হাতে তুলে দিতে চাপ দেয় বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। এরপর শামীমকে মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মামলার এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ফজলুল হক আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শামীমের বিবস্ত্র ছবি প্রকাশ করেন এবং ফেসবুক লাইভে তাঁর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ।
আগের ঘটনাতেও আমিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ফজলুল হক আমিনী ধর্মীয় বিষয়ে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তাঁদের দাবি, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণ পারুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় এবং তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়।
একই ধরনের অভিযোগে কুলিয়ার সোহাগ ও দক্ষিণ পারুলিয়ার এক ইউপি সদস্যের ওপর হামলা এবং তাঁদের বাড়ির মালামাল লুটের অভিযোগও করেন ওই বাসিন্দারা। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জামায়াতের বক্তব্য
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, শামীম হত্যার সঙ্গে তাঁর দলের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের নেতা-কর্মীদের নাম উল্লেখ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
দুই আসামি গ্রেপ্তার, বাকিদের খুঁজছে পুলিশ
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আব্দুল জলিল বৃহস্পতিবার রাতে মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে আরও নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ওসি জানান, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোক্তার আলীকে বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর বাড়ি থেকে এবং আসাদুল ইসলাম মোল্লাকে শুক্রবার সকালে নাজিরের ঘের এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
মামলার অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনগতভাবে নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।
