যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জনএফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সরকার, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সরকার জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ নেই। এ ঘটনার জন্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেছেন জামায়াত আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছে এনসিপি। এদিকে ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা।
জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত সম্মানিত নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিদেশের মাটিতে এই হেনস্তার ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট একদল লোক জড়িত ছিল বলে মনে করছে সরকার।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিউইয়র্কে বাংলাদেশের মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে বলেছে, যাতে হেনস্তার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশ ও দেশের সব নাগরিকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
এদিকে গতকাল ফেসবুকে দেওয়া এক বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, পরাজিত ও পলাতক শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রেও তার অনুসারীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় তার অনুসারীদের কর্মকাণ্ডের দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সরকারের দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান জামায়াত আমির।
এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, জেএফকে বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির সহিংস ও অমানবিক চরিত্র আবার উন্মোচিত করেছে। জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার দুবছর পরও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর চরিত্রে পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম জুলাই গণহত্যাসহ ফ্যাসিবাদী আমলের গুম-খুনে জড়িতদের বিচার শেষ করে দ্রুত রায় কার্যকর এবং গণহত্যা ও সন্ত্রাসের দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার শুরুর দাবি জানান।
সাবেক উপদেষ্টাদের ক্ষোভ
জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টারা। গতকাল যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অব্যাহত হয়রানি, অনলাইনে অপপ্রচার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণের ঘটনায় আমরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করছি এবং এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ যখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। বছরের পর বছর লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন ও দুর্নীতি, পদ্ধতিগত স্বৈরাচার এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনে দেশটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এই অন্তর্বর্তী সরকারই ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিয়মিত সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য প্রথার অবসান ঘটিয়েছিল।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তাদের আশা ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও স্বার্থান্বেষী মহল নিরলসভাবে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে এবং অধ্যাপক ইউনূসকে শারীরিকভাবে হুমকি দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাপক জনসমর্থন ক্ষুণ্ন করা এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নেওয়া এ ধরনের কাপুরুষোচিত কৌশলের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাতে চাই, ভয়ভীতি, মিথ্যাচার, অনলাইন হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত হুমকি— কোনো কিছুই জুলাই যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা বাস্তবায়নে আমাদের সংকল্প ভাঙতে পারবে না। বাংলাদেশের জনগণ এবং তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত সংস্কার ও মর্যাদার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেটকে অপপ্রচার এবং ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ও তার সমর্থকদের প্রচেষ্টা দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না, মুছে ফেলতেও দেওয়া হবে না।’
বিবৃতিদাতারা হলেন— অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ড. এম. ফাওজুল কবির খান, শিক্ষাবিদ সি আর আবরার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আদিলুর রহমান খান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক ই আজম, বীর প্রতীক, উবিনিগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, সমাজবিজ্ঞানী, ব্রতীর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী শারমীন সোনিয়া মুরশিদ, চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
