দীক্ষা ভুঁইয়া:
প্রেম, সাম্প্রদায়িক হিংসা আর মানুষের পরিচয়—বাংলার ইতিহাসের এক অস্থির অধ্যায়কে কল্পকাহিনির মাধ্যমে তুলে ধরলেন আইএএস আধিকারিক। তাঁর উপন্যাস ‘রুস্তম খান সন অফ নোয়াখালি’-র বাংলা সংস্করণ ‘নোয়াখালির রুস্তম খান’ প্রকাশিত হল কলকাতায়।
ইতিহাসের কিছু অধ্যায় সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়, কিন্তু সেই ইতিহাসের রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলি থেকে যায়। ধর্মের পরিচয় কি মানুষের পরিচয়ের চেয়ে বড়? সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আবহে ভালবাসা ও মানবিকতার জায়গা কোথায়? এই প্রশ্নগুলিকেই সামনে রেখে নোয়াখালি ও কলকাতার দাঙ্গার ঐতিহাসিক পটভূমিতে উপন্যাস লিখেছেন আইএএস আধিকারিক সি মুরুগান। তাঁর ইংরেজি উপন্যাস ‘রুস্তম খান সন অফ নোয়াখালি’ এবং তার বাংলা সংস্করণ ‘নোয়াখালির রুস্তম খান’ প্রকাশ করেছে দীপ প্রকাশন। কলকাতা প্রেস ক্লাবে বই দু’টির উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত সময়, তার মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রেম এবং মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার লড়াই। কাহিনির নায়ক নোয়াখালির লামচরের তরুণ রুস্তম খান। সে ভালবাসে জমিদারকন্যা নীলাঞ্জনাকে। কিন্তু তাদের সম্পর্কের সামনে রয়েছে ধর্মীয় পরিচয়, শ্রেণিগত ব্যবধান এবং ক্রমশ ঘনীভূত হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রুস্তম কলকাতায় আসে। পরে পরিস্থিতির টানে তাকে ফিরে যেতে হয় নোয়াখালিতে। সেখানে সাম্প্রদায়িক হিংসার মধ্যে মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব তার ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
রুস্তমের এই যাত্রা শুধুমাত্র একটি প্রেমের গল্প নয়। বরং হিংসা ও বিদ্বেষের সময়ে একজন মানুষের অবস্থান কী হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও তুলে ধরে। যখন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বন্ধু ও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর অর্থ কী? নিজের ভালবাসা, স্বপ্ন এবং অন্যের জীবন রক্ষার দায়িত্বের মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে রুস্তম? এই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে উপন্যাসের কাহিনি।
কেন নোয়াখালি ও কলকাতার দাঙ্গা?
সি মুরুগানের কাছে বাংলার ইতিহাসকে বেছে নেওয়ার পিছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা। পশ্চিমবঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটানোর সুবাদে এ রাজ্যের মানুষ, সংস্কৃতি ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছে। সেই পরিচয় থেকেই বাংলাকে পটভূমি করে একটি উপন্যাস লেখার ইচ্ছা জন্মায়।
লেখকের কথায়, বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগোলিক সৌন্দর্যকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কাল্পনিক কাহিনি নির্মাণের ইচ্ছাও ছিল। প্রথমে তাঁর ভাবনায় ছিল কুপার্স ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে একটি গল্প। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোয়াখালি ও কলকাতার দাঙ্গার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তাঁকে বেশি করে আকৃষ্ট করে। সেই পটভূমিতেই তৈরি হয় রুস্তম খানের গল্প।
উপন্যাসটি লেখার আগে তিনি শিয়ালদহের গ্র্যান্ড টাওয়ার হোটেল, নোয়াখালির দাঙ্গা, কাজের সন্ধানে নোয়াখালি থেকে কলকাতায় আসা মুসলিমদের জীবন এবং সাম্প্রদায়িক হিংসায় প্রাণ হারানো সাধারণ মানুষদের নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। ইতিহাসের এই উপাদানগুলিকে কল্পকাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি এমন একটি গল্প বলতে চেয়েছেন, যেখানে বাংলার অতীতের পাশাপাশি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং সংকটও জায়গা পেয়েছে।
মুরুগানের বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিচার করা উচিত নয়। মানুষের মধ্যে থাকা সহমর্মিতা ও মানবিকতাকে চিনতে পারাই তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য। ইতিহাসের হিংসাত্মক অধ্যায়কে সামনে রেখে সেই বার্তাই পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তিনি।
ইতিহাসের সঙ্গে বাংলার সংস্কৃতির মেলবন্ধন
দীপ প্রকাশনের কর্ণধার শঙ্কর মণ্ডলের মতে, ‘রুস্তম খান সন অফ নোয়াখালি’ মানবিক অনুভূতিকে কেন্দ্র করে লেখা একটি উপন্যাস। প্রেমের কাহিনির পাশাপাশি এতে বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোককথা ও ভৌগোলিক সৌন্দর্যের বিবরণ রয়েছে। ইংরেজি সংস্করণের কাহিনি আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই বাংলা সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত পাঠকদের কাছে নোয়াখালি ও কলকাতার দাঙ্গার পটভূমি নতুন নয়। তবে সেই ইতিহাসের মধ্যে একটি কাল্পনিক চরিত্রের জীবন, তার প্রেম এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গল্প নির্মাণ করেছেন লেখক। এখানে ইতিহাস কেবল কাহিনির সময়কাল নির্ধারণ করে না, চরিত্রগুলির সিদ্ধান্ত ও সম্পর্কের উপরও তার প্রভাব পড়ে।
সি মুরুগান বর্তমানে টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত। তামিলনাড়ুতে জন্ম তাঁর। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে তাঁর তামিল ছোটগল্পের সংকলন ‘পুথ্থা কারিসাল’ এবং উপন্যাস ‘থে’ প্রকাশিত হয়েছে।
ইংরেজি ও বাংলা, দুই সংস্করণেরই দাম ৪৫০ টাকা। বইগুলি বিভিন্ন বইয়ের দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
দাঙ্গার ইতিহাসকে ঘিরে লেখা এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত থেকে যায়—ধর্মীয় পরিচয় যখন মানুষকে বিভক্ত করে, তখন মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রুস্তম খানের কাহিনির মধ্য দিয়ে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন সি মুরুগান।
