ফ্যাক্টচেক /‘নামাজ পড়লে ১০ নম্বর কম’ শিরোনামে শিক্ষকের খণ্ডিত বক্তব্য দিয়ে অপপ্রচার
ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
‘যেসব স্টুডেন্ট নামাজ পড়বে, তাদেরকে ১০ মার্ক করে কম দেওয়া হবে’—এমন ক্যাপশনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত ক্যাপশনে ‘Sonalinews.com’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। ১১ অক্টোবর বিকেল ৪টা ২৯ মিনিটে শেয়ার করা ভিডিওটি ১২ অক্টোবর দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ১ লাখ ৭ হাজার ৪০০ রিয়েকশন, ৪ হাজার ৫০০ কমেন্ট ও ১৫ হাজার শেয়ার রয়েছে।
ভিডিওটি শেয়ার করে ‘যা দেখায়নি মিডিয়া-Untold News’ নামের ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘বিএনপির নতুন বাংলাদেশে স্কুলে নামাজ পড়লে ১০ মার্ক করে কম দেওয়া হবে।’
‘Mariyam Islam’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়, ‘অপর আয়াশকে গ্রেফতার!! হিন্দুর কারনে। নামাজ পড়লে ১০ নম্বর কাটা যাবে!.....আমাদের প্রশ্ন—এই শিক্ষককে কে এমন অধিকার দিয়েছে? শিক্ষার্থীর ধর্মীয় চর্চার জন্য নম্বর কাটার নিয়ম কোন শিক্ষাব্যবস্থায় আছে? এই বক্তব্যের জবাব চাই। শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে নীরব থাকার সুযোগ নেই।’
ছড়িয়ে পড়া পোস্টের কমেন্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে আক্রমণাত্মক কমেন্ট করলেও কেউ কেউ দাবি করেন, ভিডিওটি কাটছাঁট করা হতে পারে। এ ছাড়া আলোচিত দাবিতে অন্তত ৫০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
ছড়িয়ে পড়া মাত্র ছয় সেকেন্ডের ভিডিওতে একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘যেসব স্টুডেন্ট নামাজ পড়বে, তাদেরকে ১০ মার্ক করে কম দেওয়া হবে।’ তবে ভিডিওতে ওই ব্যক্তির পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া ভিডিওতে হ্যাশট্যাগ হিসেবে বাগেরহাট ও সোনালিনিউজ লেখা রয়েছে।
অনুসন্ধানে ‘Sonalinews.com’ নামের ফেসবুক পেজে ১২ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে প্রকাশিত আরও একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘নামাজ বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে বিপাকে বাগেরহাটের হিন্দু শিক্ষক’ ক্যাপশনে শেয়ার করা ৫৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে আলোচিত ক্লিপের ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ—এখানে নামাজের সুব্যবস্থা রয়েছে। সব ব্যাচ তোমরা প্রতিদিন এখানে নামাজ পড়বা। আমি ধর্মীয় শিক্ষককে বলেছি, যেসব স্টুডেন্ট নামাজ পড়বে না, তাদেরকে ১০ মার্ক করে কম দেওয়া হবে। কারণ এখানে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমি যদি তোমাদের নামাজের দিকে ধাবিত করতে পারি... এই বয়সটা কিন্তু ভুল বা অসৎ পথে যাওয়ার সময়। তোমরা নামাজ পড়লে এই পথ থেকে পরিত্রাণ পাবা। ফেসবুকে বা বিভিন্ন জায়গায় কত খারাপ কাজ দেখি, কিন্তু আমাদের মেয়েরা অটল। আমাদের মেয়েরা কোনো খারাপ পথে চলে না, আমি তোমাদের নিয়ে গর্ববোধ করি মা। তোমাদের সব জায়গায় আমি “মা” বলে ডাকি। তোমাদের শাসন করার অধিকার যেমন আমার আছে, তেমনি সোহাগ করার অধিকারও আছে মা।’

এ ছাড়া, ‘জেনজি পলিটিক্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ভিডিওটির আরও দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায়। ৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, ‘আগের ভিডিও যাচাই করা হয়নি তার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।’
ওই ভিডিওতে ওই ব্যক্তিকে বলতে দেখা যায়, ‘আজ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিনের এই আয়োজন করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আজকে তোমাদের কিছু কথা বললাম, কারণ আজকের এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য তোমরা নিজেরাই হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারছ না। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের আজকের এই দিনে যদি হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ না করতেন, তবে পুরো পৃথিবী অন্ধকারেই থেকে যেত। আমি কোনো ধর্ম-বর্ণ বুঝি না, এটি আমি অন্তরে বিশ্বাস করি। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম হয়েছিল বলেই আজ শুধু মক্কা নগরী নয়, সমগ্র বিশ্ব আলোকিত হয়েছে। আজ মুসলিম বিশ্ব মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, যার মূল কাণ্ডারী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। আমি তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না, তবে এটুকু বিশ্বাস করি যে, তোমরা যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো এবং ধর্মের নির্দেশ মেনে চলো, তবে জীবনে অনেক দূর যেতে পারবে।’
এরপর তিনি বলেন, ‘শুধু তোমাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ... তেমনি সোহাগ করার অধিকারও আছে মা।....’

পুরো ভিডিওতে তিনি মূলত নামাজ, ধর্ম এবং মহানবী (সা.)-কে নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ঈদে মিলাদুন্নবীর আয়োজনটি সুন্দর করতে তাঁর প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি আগত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আয়োজনটি বড় পরিসরে করতে তিনি কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন, তা-ও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
ঘটনার দীর্ঘদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সেই বক্তব্যের মাত্র ৬ সেকেন্ডের একটি খণ্ডিত অংশ ভাইরাল করা হয়েছে। পুরো বক্তব্যটি শুনলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিষয়টি কেবলই একটি কথার ভুল (স্লিপ অব টাং) ছিল; কারণ বক্তব্যের আগে ও পরে তিনি শিক্ষার্থীদের মূলত নামাজ পড়তেই উৎসাহিত করেন।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘স্কুলে নামাজ বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে বিপদে বাগেরহাটের হিন্দু শিক্ষক’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচিত ব্যক্তির নাম সমর কৃষ্ণ রায়। তিনি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

প্রতিবেদনে সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, ‘আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ছাত্রীদের নামাজের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করেছি এবং প্রায় ২২ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনেছি। নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলেছি। তবে বক্তব্য দিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত “না” শব্দটি বাদ পড়ে যায়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটির অনুমোদনে পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে ব্যয় করা হয়েছে। শিক্ষকদের ও ছাত্রীদের কাছ থেকেও টাকা সংগ্রহ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি আর্থিক সহযোগিতা করেন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। মুসলিম ধর্মের প্রতি অসম্মান থাকলে এত আয়োজন করে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করতাম না।’
প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিমের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং মুসলিম। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে মুসলিম ধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শ্রদ্ধা দেখেছি। তিনি মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করেন এবং ছাত্রীদের নামাজ পড়তে উৎসাহ দেন। সম্প্রতি নামাজের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন।’
এ ছাড়া, ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান প্রতিবেদনে বলেন, ‘সাংবাদিকেরা হচ্ছেন সমাজের দর্পণ। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তাই কোনো বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপন করুন। আমি পুরো বক্তব্যটি দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রধান শিক্ষক অসাবধানতাবশত কথাটি বলে ফেলেছেন। পরে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তাই বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে সংবাদ প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ ছাড়াও অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেকে আলোচিত ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করেন, মূলত আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করেই এমনটি করা হয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ বলেন, প্রথমদিকে ভিডিওটি দেখে তাঁরাও বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।
সিদ্ধান্ত
‘নামাজ পড়লে শিক্ষার্থীদের ১০ নম্বর কম দেওয়া হবে’—এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। মূলত, ভিডিওটি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়ের দীর্ঘ বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ, যা আলোচিত দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা

