হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো ভবনের সামনের এলাকায় থাকা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনসের পরিত্যক্ত ১২টি উড়োজাহাজ সরাতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছে। একদিকে উড়োজাহাজগুলো বিক্রি করতে গিয়ে প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মূল্যবান জায়গা দখল করে থাকায় রাজস্ব আয়ের সুযোগ বন্ধ হয়ে আছে। এ নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ দর উঠেছে তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার, করসহ যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে দখলমুক্ত জায়গায় নতুন করে প্রায় ১২টি পার্কিং বে তৈরি করা সম্ভব। এ অবস্থায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিলামের উদ্যোগ নিলে বিমান মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়ে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো কেনার জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান লিখিত আবেদন করে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো— এরোপোরিয়া
অ্যারোস্পেস, সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড।
পরবর্তী সময়ে বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো অপসারণ ও নিলামে বিক্রির বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। চলতি বছরের ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্ত করার আইনগত প্রক্রিয়া, নিলামের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ এবং আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাখিল করা দরপত্র নিয়ে আলোচনা হয়। সর্বোচ্চ দরদাতার প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে নিলামের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ এবং বিমান মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে মোতাবেক বিমান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সর্বোচ্চ দরদাতা এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেসের দেওয়া তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ভিত্তিমূল্য ধরে অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা যায়, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজগুলোর উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করে সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও সেগুলো অপসারণ করা হয়নি। পরে চূড়ান্ত নোটিশ, কর্তৃপক্ষের গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করে বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্তের আদেশ জারি করা হয়। একই বছরের ১ জুন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও বিষয়টি অবহিত করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে উড়োজাহাজগুলোর মালিকানা ও ঋণের দায় নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
আইনি মতামত অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাতিল চেয়ে অর্থঋণ আদালতে আবেদন করে। এ-সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে রয়েছে।
এদিকে উড়োজাহাজগুলো সরাসরি কেনার আগ্রহ দেখিয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। এর মধ্যে এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস তিন লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর প্রস্তাব করে। মুদ্রা বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ দাঁড়ায় চার কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। করের হিসাবসহ প্রস্তাবটির মোট মূল্য পাঁচ কোটি ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬২৫ টাকা। অর্থাৎ সর্বোচ্চ দরও করসহ প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সেনা কল্যাণ সংস্থা কর ছাড়া তিন কোটি সাত লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড ঢাকা দুই লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর প্রস্তাব করে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলেন, উড়োজাহাজগুলোর আর্থিক মূল্য নিয়ে দরপত্রে যে চিত্র উঠে এসেছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা বিমানবন্দরের জায়গা দখল করে থাকা। একদিকে দাম পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে পার্কিং এলাকার বিশাল জায়গা দখল করে রয়েছে। বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম মিলিয়ে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় জায়গার অভাবে উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো ওঠানামা এবং যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এ জায়গা দখলমুক্ত করা গেলে সেখানে আনুমানিক ১২টি নতুন পার্কিং বে তৈরি করা সম্ভব। এসব পার্কিং বে ব্যবহার করে উড়োজাহাজের অবতরণ, রুট নেভিগেশন এবং রাতের অবতরণ ও উড্ডয়নসহ বিভিন্ন সেবার বিপরীতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকেও এ বিষয়ে আইনি মতামত দেওয়া হয়। তাতে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ আপাতত বেবিচকের আলাদা হিসাবে জমা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন প্যানেল আইনজীবীর চূড়ান্ত মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী কার্যক্রম।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান আমাদের সময়কে বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিমান ক্রয়ের প্রস্তাবনা পেয়েছি। সেখান থেকে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন আসার পরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
