আসন্ন প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ। প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা পরিবহন, জ্বালানি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং মাতারবাড়ী–মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পেলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না। দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছ চুক্তি, ঋণের বোঝা, পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের বঞ্চনা এই সম্ভাবনাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত—সহযোগিতার অর্থায়ন কাঠামো হবে স্বচ্ছ, ঋণের শর্ত হবে সাশ্রয়ী, প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে জবাবদিহিমূলক এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের কাছে। বিশেষত মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে যে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাতে স্থানীয় জনগণকে ভূমি হারিয়ে উন্নয়নের দর্শক হয়ে থাকতে দেওয়া যাবে না।
১. সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জ-
বড় প্রকল্পে একাধিক মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, ঠিকাদার ও বিনিয়োগকারীর সম্পৃক্ততা বাস্তবায়নকে জটিল করে তোলে। দায়িত্বের অস্পষ্টতা, দুর্বল সমন্বয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব প্রকল্পের ব্যয় বাড়ায় ও কাজ বিলম্বিত করে। অতীতের ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে।
দাবি হলো, প্রতিটি প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, বাস্তবায়নের সময়সীমা, ব্যয়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অনিয়মের অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অর্থায়ন, ঋণের বোঝা ও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি-
প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা সম্পূর্ণ অনুদান নয়। এতে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের অর্থায়ন থাকতে পারে। ফলে পুরো অর্থকে নিশ্চিত অনুদান বা ইতিমধ্যে পাওয়া অর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। প্রস্তাব, চূড়ান্ত অনুমোদন, চুক্তি ও অর্থ ছাড়ের পর্যায়গুলো স্পষ্টভাবে আলাদা করতে হবে।
ঋণের সুদ, পরিশোধের মেয়াদ, গ্রেস পিরিয়ড, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং ক্রয়সংক্রান্ত শর্ত বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। তাই অর্থায়নের প্রতিটি উপাদানের শর্ত প্রকাশ এবং ঋণের স্থায়িত্ব যাচাই অপরিহার্য।
বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত, সম্ভব সর্বনিম্ন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ড, বাস্তবসম্মত পরিশোধসূচি এবং প্রকল্পের আয় ও উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঋণ। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রকল্প বাদ দিতে হবে। ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিটি প্রস্তাব স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে এবং জনগণের অর্থের অপচয়ের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
৩. পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা
মাতারবাড়ী–মহেশখালীতে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন উপকূলীয় পরিবেশ, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও পানিসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি বিবেচনায় না নিলে বিপুল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সম্মিলিত পরিবেশগত ঝুঁকি নিরূপণ এবং স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
দাবি হলো, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ছাড়া কোনো প্রকল্প এগোনো যাবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য শোধন, উপকূল সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। পরিবেশগত শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ
মাতারবাড়ী–মহেশখালীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভূমিহারা ও পেশাহারা মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণ, মাছ ধরার সুযোগ সংকুচিত হওয়া, কৃষিজমি হারানো এবং জীবিকার পরিবর্তন শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়; এগুলো পরিবার ও সামাজিক জীবনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এককালীন ক্ষতিপূরণ দিয়ে সব ক্ষতি পূরণ হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা সহায়তা দিতে হবে।
দাবি হলো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ প্রদানের সময়সীমা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রকাশ করতে হবে। মাতারবাড়ী–মহেশখালী উন্নয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মৎস্যজীবী, কৃষক, নারী, তরুণ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—মিডার পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এবং নিয়মিত গণশুনানি প্রতিষ্ঠা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং যোগ্যতাভিত্তিক চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে স্থানীয় উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
৫. স্বচ্ছ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি
প্রকল্পের চুক্তি, ব্যয়, দরপত্র, ঠিকাদার নিয়োগ ও অগ্রগতির তথ্য গোপন থাকলে দুর্নীতি ও জনঅবিশ্বাস বাড়ে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট, অর্থায়নের উৎস, বাস্তবায়ন সময়সূচি, ব্যয় বৃদ্ধির কারণ এবং অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
দাবি হলো, ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত সহযোগিতার জন্য প্রকল্পভিত্তিক উন্মুক্ত ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে প্রতিশ্রুত অর্থ, চুক্তিবদ্ধ অর্থ, ছাড় করা অর্থ, ব্যয়, বাস্তব অগ্রগতি ও পরিবেশগত শর্ত পালনের তথ্য থাকবে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সংসদীয় কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাধীন নিরীক্ষা ও নিয়মিত মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতা শুধু অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির শর্ত নয়; জাপানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সম্পর্ক রক্ষারও ভিত্তি।
৬. দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণ
অবকাঠামো নির্মাণের পর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। মাতারবাড়ীকে বিচ্ছিন্ন বন্দর হিসেবে নয়, সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কাস্টমস, গুদামজাতকরণ, শিল্পাঞ্চল এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনের কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন।
জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু নির্মাণকালীন অস্থায়ী চাকরি নয়, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
দাবি হলো, প্রতিটি প্রকল্পের অনুমোদনের সময়ই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পের আয়, ব্যয় ও সম্ভাব্য চাহিদার বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস ছাড়া বড় বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
৭. কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব সুফল
জাপানের সঙ্গে প্রস্তাবিত সহযোগিতাকে কার্যকর করতে প্রকল্পভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। ২০২৬–২০৩১ মেয়াদ প্রযোজ্য হলে কোন প্রকল্প কখন শুরু হবে, অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে, কোন সংস্থা দায়িত্ব পালন করবে এবং কী ফলাফল প্রত্যাশিত—তা স্পষ্ট করতে হবে।
প্রতি বছর ব্যয় ও নির্মাণ অগ্রগতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, পরিবেশগত প্রভাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জীবনমান মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ না হলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশের আলোচনার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—সাশ্রয়ী অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের অধিকার সুরক্ষা। শুধু অর্থায়নের অঙ্ক বড় হলেই চুক্তি সফল হয় না; শর্ত ও ফলাফলই নির্ধারণ করে প্রকৃত সাফল্য।
লেখক– রশীদ আহমেদ চৌধুরী, আয়কর আইনজীবী, সদস্য -সিটিবিএ, চট্টগ্রাম
