খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
দেশে প্রায় ছয় কোটি মানুষ এখনো সাধারণ মুঠোফোনে কথা বলার মতো মৌলিক সেবার ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় ২জি ফোনের উৎপাদন ও আমদানি সীমিত করা এবং পর্যায়ক্রমে নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। বাকি ৬০ শতাংশের হাতে রয়েছে সাধারণ বা ফিচার ফোন। সব মিলিয়ে দেশে প্রায় ছয় কোটি ফিচার ফোন ব্যবহার হচ্ছে। ফলে এসব গ্রাহককে ৪জি-সমর্থিত ফোনে স্থানান্তর করতে হলে শুধু পুরোনো প্রযুক্তি বন্ধের ঘোষণা যথেষ্ট হবে না, প্রয়োজন হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও আর্থিক সহায়তা।
বিটিআরসি গত ১৬ জুন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে ২জি ব্যবহার কমানোর বিষয়ে একটি কর্মশালা করে। সেখানে ব্যবহার কমার সম্ভাব্য হার বিবেচনায় ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালকে কেন্দ্র করে তিনটি সময়সীমা আলোচনায় আসে। বছরে ১৫ শতাংশ হারে ব্যবহার কমলে ২০২৯ সাল, ১০ শতাংশ কমলে ২০৩০ সাল এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমলে ২০৩১ সালে ২জি বন্ধের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে কর্মশালায় আলোচনা হয়।
তবে এসব সময়সীমা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি গ্রাহকদের নতুন ফোন কেনার সামর্থ্যকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রস্তাব, মোবাইল অপারেটরদের বিশেষ সংযোগ প্যাকেজ চালু, কিস্তিতে ফোন বিক্রি এবং দুই থেকে চার শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একান্ত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি ভর্তুকিও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে দেশে বর্তমানে কিস্তিতে ফোন ক্রয়ের সুযোগ দিচ্ছে যেসব কোম্পানি তারা প্রায় ২৪% সুদ নিচ্ছে। এরকমই একটি ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ‘পামপে’। যারা স্মার্টফোনকে সহজলভ্য করার নামে ভোক্তাদের ঋণে ফাঁদে ফেলছে। শুরুতে কম টাকা দিয়ে ফোন হাতে পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাকি অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সুদ ও অন্যান্য চার্জ। নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ফোন লক করে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য জরুরি যোগাযোগ, শিক্ষা কিংবা কাজের উপকরণ হয়ে ওঠা স্মার্টফোন একসময় ঋণের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সাধারণ ২জি ফোনের সর্বনিম্ন দাম ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা। অন্যদিকে, ৪জি-সমর্থিত ফিচার ফোনের সর্বনিম্ন দাম প্রায় তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ নতুন ফোন কিনতে একজন গ্রাহককে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার টাকা ব্যয় করতে হবে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাজারের চাপ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মেমোরি চিপের সংকটে বিশ্বে মুঠোফোন সরবরাহ কমতে এবং গড় দাম বাড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোনের চালান ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর জন্য চিপের চাহিদা বৃদ্ধি এই সংকটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব পড়লে কম দামের ফোনের সরবরাহ আরও চাপে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এরইমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বাজারে আনা দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার ৪জি ফিচার ফোন প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। পরে ছাড় দিয়েও কিছু ফোন অবিক্রীত থেকে যায়।
সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাব, ২০২৮ সালের জুন থেকে ২জি ফোনের উৎপাদন সীমিত বা বন্ধ করার পাশাপাশি ৪জি ফিচার ফোনের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর আগে বিষয়টি নিয়ে প্রচারণা, বিশেষ মূল্যছাড়, কিস্তি এবং অপারেটরদের প্যাকেজের মাধ্যমে গ্রাহকদের নতুন ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে অবৈধ পথে ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে হ্যান্ডসেট আমদানি ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া অত্যান্ত জরুরি। বৈধ উৎপাদন ও আমদানি সীমিত হলেও অবৈধ ফোনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কর্মসংস্থান কমতে পারে। সারা দেশে একযোগে ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে প্রথমে ঢাকা মহানগরে পরীক্ষামূলকভাবে বন্ধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এরপর অন্যান্য মহানগর, জেলা ও উপজেলা সদর এবং সর্বশেষে গ্রামাঞ্চলে পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় কোনো অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী, সেখানে আগে ওই অপারেটরের ২জি সেবা বন্ধ করে গ্রাহক-ভোগান্তি পর্যবেক্ষণেরও প্রস্তাব রয়েছে।
এ বিষয়ে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি জাকারিয়া শাহিদ বলেন, দেশে প্রায় ৬ কোটি মানুষ ২জি ফিচার ফোন ব্যবহার করছে। এই নেটওয়ার্ক বন্ধের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক হতে পারে। ২জি ফোন ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ স্বল্প আয়ের মানুষ, যাদের কাছে ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকার একটি ফোন প্রয়োজনীয় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাদের জন্য ৩,০০০ টাকা বা তার বেশি দামের ৪জি ফিচার ফোন কেনা বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় নিয়ে স্বল্পসুদে ঋণ, কিস্তিতে ফোন কেনার সুবিধা এবং অতিদরিদ্র গ্রাহকদের জন্য সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা না করে ২জি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা টেলিযোগাযোগ সেবার বাইরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিরোধী নই, আমরা চাই বাংলাদেশের মোবাইল বাজার সময়োপযোগী প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাক। তবে দেশের বিপুলসংখ্যক ফিচার ফোন ব্যবহারকারীর বাস্তবতা, স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ২জি-এর তুলনায় ৪জি ফিচার ফোনের অতিরিক্ত প্রায় ২,০০০ টাকা মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এই রূপান্তর পরিকল্পনা করতে হবে। ২জি ফোনের উৎপাদন ও আমদানি সীমিত করার আগে সাশ্রয়ী ভয়েজ এবং ডাটা প্যাকেজের মাধ্যমে ৪জি ফিচার ফোনের প্রতি গ্রাহকের আগ্রহ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ পথে ২জি ফোন আমদানি ও নেটওয়ার্কে সংযুক্তি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈধ উৎপাদক ও আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন এবং দেশীয় হ্যান্ডসেট শিল্প ও কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। তাই বাজারের চাহিদা, গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা এবং অবৈধ হ্যান্ডসেট প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই বাস্তবসম্মত ও পর্যায়ক্রমিক রোডম্যাপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
