ঢাকা: দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে সরকার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানদের ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতার আওতায় আনা হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ সময় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। পাইলটিং পর্যায়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে প্রক্সি মিন্স টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে।
পাইলটিং কার্যক্রমে বরাদ্দ করা ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার মধ্যে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা উপকারভোগীদের ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, চলতি বছরের জুলাই থেকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা বিতরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ হবে পরিবার
মন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রক্সি মিন্স টেস্ট পদ্ধতিতে দেশের পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। শ্রেণিগুলো হলো অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত।
তিনি বলেন, পিএমটি স্কোর ৮৬০ বা তার কম হলে নারী পরিবারপ্রধানকে ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সব নারী পরিবারপ্রধান ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। তবে ভাতা দেওয়া হবে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলের তুলনামূলক কম স্কোর পাওয়া পরিবারগুলোর নারী পরিবারপ্রধানদের।
মাঠে ৬৬ হাজারের বেশি তথ্য সংগ্রহকারী
সোমবার থেকে দেশব্যাপী সব এলাকার খানা বা পরিবারের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রম পরিচালনায় ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্যভান্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের প্রশিক্ষণের প্রথম পর্যায় ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহকারীরা বিশেষায়িত ট্যাবলেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। সংগৃহীত তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেজে যুক্ত হবে। এ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য মোবাইল সিম কার্ড সংগ্রহ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আনুমানিক ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রতি পাঁচজন সদস্যকে একটি পরিবার হিসেবে বিবেচনা করে এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে পিএমটি পদ্ধতিতে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে যোগ্য উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
চলতি অর্থবছরে ৪০ লাখ নারী পাবেন কার্ড ও ভাতা
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন করে ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরবর্তী তিন অর্থবছরে যোগ্য সব নারী পরিবারপ্রধানকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও জানান, উপকারভোগীদের ফ্যামিলি কার্ডে ডুয়াল চিপ, কিউআর কোড ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (এনএফসি) প্রযুক্তি থাকবে। কার্ডটি সরকারের টাকাপের পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে উপকারভোগীরা ব্যাংকের এটিএম বুথ, বিপণিবিতানের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) মাধ্যমে ভাতার টাকা তুলতে পারবেন।
সরকারের এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থার একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি হবে। এর ভিত্তিতে যোগ্য নারী পরিবারপ্রধানদের শনাক্ত করে পর্যায়ক্রমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
