‘শরীরের একটা অংশ প্রায় অবশ হয়ে ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার পর প্রথমে দেড় মাস একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হাসপাতালটি রাশিয়ার দখলকৃত ইউক্রেনের অংশে পড়েছিল। সেখান থেকে পরে আমাকে রাশিয়ার কাজান শহরের পাশে একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
চিকিৎসাধীন থাকার সময় রাশিয়ান একজন নারী চিকিৎসক আমাকে সেখান থেকে পালাতে সহায়তা করেন; রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর পর দূতাবাসের সহযোগিতায় ট্রাভেল পাস নিয়ে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশে ফিরেছি।’
গতকাল বুধবার নিজের জীবনের করুণ গল্প শোনালেন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আসা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন (২২)। ইউক্রেন বাহিনীর ড্রোন হামলায় কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। ডান পায়েও চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। রাজন কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের কৃষক আবদুল কাদের কালুর ছেলে। এখন ক্র্যাচে ভর করে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে।
রাজন জানান, ৮ মে বাংলাদেশ থেকে ৩০ জনের একটি টিম রাশিয়ায় যায়। তাদের সেখানে পিআরও টেকনোলজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭৫ হাজার রুবলের বিনিময়ে কাজ দেওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশি যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজন বড় স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় যান, তাদের ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। জমি বিক্রি, বন্ধক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার টাকা জোগাড় করে রাজনের পরিবার।
রাজন আরও জানান, যে প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা ছিল, সেই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। এটি রাশিয়ায় পৌঁছার পর জানতে পারেন। পরে ১৩ মে ইউক্রেনের যে অংশ রাশিয়া দখল করেছে, সে ধরনের একটি এলাকায় নেওয়া হয়। একটি বাঙ্কারে তাদের রাখা হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশি ৩০ জনের দলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি ভাগে ছিল ১৬ জন। আরেকটিতে আটজন। অন্যটিতে ছয়জন। রাজন ছিলেন ছয়জনের দলে।
রাজন বলেন, ড্রোন হামলায় আমার দলের মেহেদী, মিন্টু, রিপন ও মামুন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে মিন্টুর গ্রামের বাড়ি যশোর, রিপনের গাজীপুর, মামুনের ময়মনসিংহ ও মেহেদীর ঢাকায়। ১৪ জুন রাজনের ওপর আঘাত হানে ড্রোন। এরপর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কোমরের নিচে আঘাত পান। চার দিনে ৪ কিলোমিটার পথ বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের অংশে তাদের ক্যাম্পে পৌঁছান। এরপর তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। পরে কাজান শহরের আরেকটি হাসপাতালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার সময় রাশিয়ান এক ডাক্তার তাঁকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান।
রাজন আরও জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার পরপর তাদের পাসপোর্ট নিয়ে যান রিক্রুটিং এজেন্সির লোকজন। এ কারণে রাশিয়া থেকে তাঁকে ট্রাভেল ভিসা নিয়ে ফিরতে হয়েছে। রাজনের দেওয়া তথ্যানুসারে, ৩০ বাংলাদেশিকে একটি বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলে তিন থেকে চার দিন রাখার পর ব্যাংককার্ড, সিমকার্ডের কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় দালাল চক্রের রাশিয়ান সিন্ডিকেট। পরে কাজের কথা বলে রাজনসহ অন্যদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি অজ্ঞাত রুশ সেনাক্যাম্পে। যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয়টি টের পেয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে অনেকে আকুতি জানান। এরপরও তাদের যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
রাজন বলেন, আমাদের দলের ২০ জন মারা গেছেন। এক দিনে মারা গেছেন ১৭ জন। তাদের মধ্যে অনেকের নাম জানা আছে। অনেকের জেলার নামও জানি। আমরা যে তিনটি গ্রপে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেছি, সেটি কাছাকাছি এলাকায় ছিল। একই ব্যাটালিয়নের আওতায় আমরা ছিলাম। আমাদের সবার কাছে ওয়াকিটকি দেওয়া হয়েছিল। সহযোদ্ধাদের লাশ চোখের সামনে পড়ে ছিল।
ব্র্যাকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বৈধভাবে রাশিয়ায় গেছেন আট হাজার ৬১৮ বাংলাদেশি।
