কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অন্যতম প্রধান ও জটিল এক সমস্যা সমাধানের পথে বড় ধাপ এগিয়ে যাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা।
প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী এ নতুন প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে বলে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
এর মাধ্যমে একেবারে নতুন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তৈরি থেকে শুরু করে উচ্চসক্ষমতাওয়ালা ব্যাটারি ও উন্নতমানের নতুন কনটেন্ট তৈরির গবেষণায় নজিরবিহীন অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।
বর্তমান বিভিন্ন কম্পিউটার যেমন ‘১’ ও ‘০’ সংকেতের ওপর ভিত্তি করে চলে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি সেখানে পরমাণু ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক নিয়মকে কাজে লাগিয়ে এই দুটি অবস্থার মধ্যকার অবস্থান তৈরি করে হিসাব-নিকাশ করে।
তবে এ বিপুল সম্ভাবনার পরও বড় প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তিকে আটকে রেখেছে। সেটি হচ্ছে, কোয়ান্টাম সিস্টেমের সহজাত অস্থিতিশীল আচরণ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সিস্টেমে বিভিন্ন ধরনের ভুল বা ত্রুটি দেখা দেয়, যার ফলে চূড়ান্ত ফলাফলগুলো আর নির্ভরযোগ্য থাকে না। তবে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালমান অবস্থাতেই নিজের বিভিন্ন অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা করতে ও সেগুলোকে পুনরায় আগের অবস্থায় ঘুরিয়ে আনতে পেরেছে।
কোয়ান্টাম প্রযুক্তির রূপান্তরকারী সক্ষমতাকে বাস্তবে রূপ দিতে ও এসব কম্পিউটারকে নির্ভরযোগ্য করে তুলতে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োগকে অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ পদ্ধতির মূল কৌশল হচ্ছে, কাজ করার সময় কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিজে থেকেই ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে তা শুধরে নেবে, যা ‘ফল্ট-টলারেন্ট’ বা ত্রুটি-সহনশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ তৈরি করে দিতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তি ত্রুটি একেবারেই বন্ধ করে দেওয়ার বদলে কাজের ফাঁকেই তা নিজে থেকে ঠিক করে নিলেও এখন পর্যন্ত কেউ তা পুরোদমে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি।
গবেষণাপত্রটির অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘রুটগার্স ইউনিভার্সিটি’র গবেষক জেবেডায়া পিক্সলি বলেছেন, “ত্রুটি-সহনশীল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে হলে আমাদের এই পরীক্ষা ও ত্রুটি সংশোধনের কাজটি কেবল এক বা দুবার করলেই হবে না, বরং একটি হিসাব-নিকাশ চলাকালীনই তা বহুবার সফলভাবে করতে হবে।
“সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পাওয়ার দীর্ঘ যাত্রায় এ পরীক্ষা মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
পরীক্ষা চলাকালে গবেষকরা কোয়ান্টাম কম্পিউটারটির স্বয়ংক্রিয় পরীক্ষা ও রিসেট করার হার বাড়াতে পেরেছেন। এতে দেখা গেছে, সিস্টেমটি খুব দ্রুত বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ফিরে এসেছে।
গবেষকরা বলছেন, এটা কোয়ান্টাম আচরণ সম্পর্কিত পূর্বাভাসকে সত্য প্রমাণ করেছে এবং বিশৃঙ্খলা থেকে কীভাবে শৃঙ্খলার জন্ম হতে পারে তা-ও স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল সমস্যাটি এর কাজের ধরনের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। প্রচলিত একটি কম্পিউটার ‘বিট’-এর ওপর ভিত্তি করে চলে, যা কেবলই ‘অন’ বা ‘অফ’ (১ বা ০) হতে পারে।
তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে ‘কিউবিট’, যা পরিমাপের আগ পর্যন্ত এই দুটি অবস্থার মধ্যবর্তী একাধিক সম্ভাব্য অবস্থায় অবস্থান করতে পারে।
এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার শক্তিশালী। তবে এর মানে হল, এখানকার তথ্য সংবেদনশীল, সামান্য তাপ, হার্ডওয়্যারের সামান্য ত্রুটি বা অন্য কোনো বিভ্রান্তিকর সংকেতের প্রভাবেই কিউবিটের অবস্থা বদলে যেতে পারে।
এর ফলে ধারাবাহিকভাবে ভুল বা ত্রুটি জমতে জমতে পুরো সিস্টেমটিই অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়ে।
গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ও আইবিএম-এর ‘কোয়ান্টাম এরর কারেকশন অ্যান্ড ডায়নামিক সার্কিটস এক্সপেরিমেন্টস’-এর প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানী মাইকা তাকিতা বলেছেন, “আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জটি কেবল একটি কিউবিট পরিমাপ করা ছিল না, বরং প্রসেসরের বাকি অংশ যখন সচল রয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তেই বারবার এই পরিমাপের কাজটি চালানো ছিল আসল চ্যালেঞ্জ।
“পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে, বর্তমান যুগের হার্ডওয়্যার বড় এক সিস্টেম জুড়ে হাজার হাজার বার কোয়ান্টাম অপারেশন, পরিমাপ ও রিসেটের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় ঘটাতে পারে।”
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আইবিএম-এর তৈরি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কোয়ান্টাম প্রসেসর ব্যবহার করেন ও সেটাকে দুটি বিপরীতমুখী কাজ পর্যায়ক্রমে করার জন্য নির্দেশ দেন।
এর একটি কাজ তথ্যকে এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল করে তুলছিল, আর অন্য কাজটি তাৎক্ষণিকভাবে সেই বিশৃঙ্খল কিউবিটগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুসারে রিসেট করে দিচ্ছিল।
পুরো প্রক্রিয়ায় গবেষক দলটি প্রায় ৫ হাজারটি অপারেশন ও ৫ হাজারটি পরীক্ষা ও রিসেট সম্পন্ন করেছে। গবেষকদের দাবি, এ ধরনের পদ্ধতির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটাই এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও সফল প্রদর্শন।
গবেষকরা বিশৃঙ্খলা তৈরি ও তা নিয়ন্ত্রণের অনুপাতও প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন। যখন বিশৃঙ্খলা তৈরির কাজ অর্ধেকের বেশি সময় ধরে চলেছে তখন সিস্টেমটি বিশৃঙ্খলই থেকে গেছে।
আবার যখন পরীক্ষার কাজ বাড়ানো হয়েছে তখন সিস্টেমটি কাঙ্ক্ষিত সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরে এসেছে ঠিক যেভাবে কাজ করার জন্য প্রসেসরটিকে প্রয়োজন ছিল।
‘লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি’র পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক জাস্টিন উইলসন বলেছেন, “ছোট ছোট পরিবর্তনও মাঝেমধ্যে এমন বড় ও প্রায় অসম্ভব-পূর্বানুমানযোগ্য পরিণতি তৈরি করতে পারে, ঠিক যেমন একটি সুপরিচিত ধারণা আছে যে, আফ্রিকায় একটি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো শেষ পর্যন্ত লুইজিয়ানায় আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
“তবে হঠাৎ হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ অনিয়ন্ত্রিত আচরণকেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব এবং এর একটি সুনির্দিষ্ট হার রয়েছে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার পরিবর্তন যে বাস্তবে টিকে থাকবে তা মোটেও সুস্পষ্ট ছিল না। তবে আমাদের গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করেছে যে এটা সত্যিই ঘটে।”
‘অর্ডার ফ্রম কেয়স উইথ অ্যাডাপ্টিভ সার্কিটস অন কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার ফিজিক্স’-এ।
