মোঃ দেলোয়ার হোসেন স্টাফ রিপোর্টার:
সুন্দরবনঘেরা সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন তীব্র হচ্ছে। লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছেন কয়েক লাখ মানুষ। বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলা এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কয়েক দশক ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে।
কিন্তু প্রকল্পের পর প্রকল্প চললেও উপকূলের মানুষের মৌলিক সংকটের কতটা সমাধান হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরও সুপেয় পানির মতো মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। কোথাও সভা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি করে ছবি তোলা হলেও পরে প্রকল্পকর্মীদের আর দেখা যায় না—এমন অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, উপকূলের মানুষের দুর্দশাকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও তার সুফল সীমিতসংখ্যক মানুষের মধ্যে আটকে থাকে। অন্যদিকে এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু শ্যামনগর উপজেলাতেই ৩৫টির বেশি এনজিও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে সুশীলন, অগ্রগতি, লিডার্স, প্রেরণা, নওয়াবেঁকী গণমুখী ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, উত্তরণ, সিইডিআইও, এনজিএফ, বারসিক, ফ্রেন্ডশিপ, সিসিডিবি, রূপান্তর, কারিতাস, ইসলামিক রিলিফ, সিএনআরএস, অ্যাকশনএইড, ডিএসকে, জেজেএস ও গুড নেইভার বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য।
সম্প্রতি শ্যামনগরের গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ, পদ্মপুকুর, কৈখালী ও রমজাননগর এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব এলাকায় সুপেয় পানির সংকট এখনো তীব্র। কোথাও সীমিতসংখ্যক মানুষের জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কোনো কোনো এলাকায় অর্থের বিনিময়ে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো উপকূলে কাজ করছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অর্থ এলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পাচ্ছেন না।
কৈখালীর বাসিন্দা আলফাজের ভাষ্য, বিভিন্ন সময় এনজিওকর্মীরা গ্রামে এসে নারী-পুরুষকে নিয়ে সভা করেন, ছবি তোলেন এবং সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। অনেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে খাবারের প্যাকেট দিয়ে কর্মসূচি শেষ করা হয়। এরপর তাঁদের আর দেখা যায় না।
গাবুরার বাসিন্দা ইয়াসির আরাফাত বলেন, উপকূলের মানুষের দুর্দশাকে অনেক সময় প্রকল্প নেওয়ার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দু-একটি পরিবার সুবিধা পেলেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সুশীলনের কৃষি প্রকল্পে প্রায় ৭১ লাখ টাকা, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং জলবায়ু প্রকল্পে প্রায় ৮৫ লাখ টাকার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সম্প্রতি স্কুল ফিডিং প্রকল্পের মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট বহনের একটি গাড়ি আটকের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
লিডার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংস্থাটি ৮ কোটি ১১ লাখ ১ হাজার ২০৪ টাকার কাজ শেষ করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্রকল্পে ১০ কোটি ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৮৩ টাকার কার্যক্রম চলমান। এ ছাড়া প্রেরণার খুলনার পাইকগাছা ও দাকোপ উপজেলায় প্রায় ২ কোটি টাকা এবং সিসিডিবির প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে এসব অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম বা আত্মসাতের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা হয়নি। স্থানীয় নাগরিকদের দাবি, প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়, উপকারভোগীর তালিকা এবং প্রকল্পের ফলাফল প্রকাশ্যে আনা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন কমবে।
সাতক্ষীরার নাগরিক নেতা আমিনুর রহমান বলেন, উপকূলের মানুষের দুর্দশা ও অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রকৃত উপকারভোগীর সংখ্যা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি প্রতিটি প্রকল্পের স্বাধীন অডিট ও সামাজিক নিরীক্ষার দাবি জানান।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচিতে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কার্যক্রমের প্রচার করা হয়। তাঁদের কেউ কেউ এটিকে প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন। কয়েকটি এনজিওতে নারী কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় সংশ্লিষ্টরা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলে দাবি তাঁদের।
যা বলছে এনজিওগুলো
অভিযোগের সঙ্গে একমত নন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি এনজিওর কর্মকর্তারা। সুশীলনের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে তাঁদের সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তন, শিশুদের স্কুল ফিডিং, কৃষি ও শিশুশ্রম প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। দেবহাটা উপজেলায় ৪ হাজার ৭৫০ শিশুকে সহায়তা দিয়ে শিশুশ্রমমুক্ত উপজেলা ঘোষণার ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক সম্পা গোস্বামী বলেন, ২০০৬ সালে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হলেও ২০১৩ সাল থেকে কার্যক্রম জোরদার করা হয়। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে ‘গল্পতরী’ নামে স্থাপনা তৈরি করে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী উন্নয়ন ও সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় কাজ করছেন তাঁরা।
লিডার্সের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এ বি এম জাকারিয়া বলেন, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০০৩ সাল থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়তা দিয়ে আসছেন তাঁরা। বর্তমানে শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি এবং খুলনার দাকোপ ও পাইকগাছায় তাঁদের ক
এ জাতীয় আরো খবর..
