বিশ্বজুড়ে প্রচলিত রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আজ তলানিতে। ক্ষমতাসীন হোক কিংবা বিরোধী, যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজের স্বার্থের গণ্ডিতে বন্দী এবং জনজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা হারিয়েছে, তার ওপর ভরসা রাখা মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। এই অনাস্থা কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; পরিসংখ্যানেও তার ছাপ স্পষ্ট। ২০২৫ সালের এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারে ২৮টি দেশের ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষের জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৬১ শতাংশ মাঝারি বা মাঝারি বা উচ্চ মাত্রার ক্ষোভ অনুভব করেন; অর্থাৎ তাঁদের মনে হয় সরকার ও বড় প্রতিষ্ঠান মুষ্টিমেয় বিত্তবানের স্বার্থই দেখে। ২০২৬ সালের সংস্করণে প্রায় ৩৪ হাজার প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেছেন, তাঁদের সরকার সমাজের বিভেদ মেটাতে ভালো কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী রিচার্ড এডেলম্যানের পর্যবেক্ষণ, আস্থা এখন আর ওপর থেকে নিচে নামে না; তা সরে গেছে সমপর্যায়ের মানুষের মধ্যে।
আস্থা যখন প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব থেকে সরে যায়, জনগণ তখন বিকল্প পথ খোঁজে। সেই পথই আজ জনস্বার্থের দাবিতে আন্দোলনের পথ। আর জনপ্রিয় নেতৃত্বের যে শূন্যস্থান সফল আন্দোলনের জন্য অপরিহার্য ছিল, তা পূরণ করছে প্রযুক্তি ও তারুণ্য।
◆ আরব বসন্ত থেকে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন: এক যুগের মানচিত্র
এই ধারার সূত্রপাত ২০১০-এর শেষে তিউনিসিয়ায়, আরব বসন্তে। সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রথমবার দেখাল, একটি ভিডিও বা একটি হ্যাশট্যাগ কীভাবে একনায়কের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোর গল ফেস গ্রিনে ‘গোটাগোগামা’ নামের প্রতিবাদী গ্রামে বড় কোনো দলীয় নেতা ছাড়াই ‘গো হোম গোটা’ স্লোগানে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন সরকারের পতন পর্যন্ত গড়ায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের হিসাবে ওই বিক্ষোভে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, এই সংখ্যা তারুণ্যের সাহসের পাশাপাশি আন্দোলনের মূল্যও মনে করিয়ে দেয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দিলে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জেন জি বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রাথমিক পুলিশি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫১, পরবর্তী সরকারি তদন্তে তা দাঁড়ায় ৭৬; বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আন্দোলনকারীরা অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে বেছে নিয়েছিলেন ডিসকর্ডের মতো অনলাইন চ্যাটরুমের আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে। সংসদভবনের বদলে একটি গেমারদের অ্যাপে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর নজির বিরল।
সর্বশেষ চলমান অধ্যায় দুটি। ভারতে ২০২৬ সালের ১৫ মে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্যে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল জাল ডিগ্রিধারীরা। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। পরদিনই অভিজিৎ দিপকে ব্যঙ্গাত্মক ‘কক্রোচ জনতা পার্টি’র ইনস্টাগ্রাম পেজ খোলেন এবং এক মাসেরও কম সময়ে অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ক্ষমতাসীন বিজেপির পেজকেও ছাড়িয়ে যায়। পটভূমিটাও বাস্তব: ভারতের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ৯.৯ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ১৩.৬ শতাংশ। ৬ জুন দিল্লিতে প্রথম রাজপথের কর্মসূচিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নফাঁস বন্ধের দাবি ওঠে। জুলাইয়ে সংসদ অভিমুখে যাত্রায় পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জের পরও আন্দোলন থামেনি, বরং মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুতে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সে ১৮ সেপ্টেম্বর ক্রেতেইয়ের একটি লিসে থেকে শুরু হওয়া লিসেয়েন (উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী) আন্দোলন কয়েক দিনেই দেশজুড়ে ছড়িয়েছে। ১ অক্টোবর দেশের প্রায় ৩ হাজার ৭০০ লিসের মধ্যে ১ হাজার ২৭টি আন্দোলনের আওতায় আসে, ২২২টিতে অবরোধ হয়, আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ২ হাজার মানুষ আটক হন। ৬ অক্টোবরের মিছিলে এএফপির হিসাবে ২ লাখ ৬৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। দাবি স্পষ্ট: শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন, ঠাসা ক্লাসরুম ও পারকুরসুপের চাপ কমাতে শিক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ। প্যারিসে বসে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয়, বিষয়টি আর কোনো একটি দেশের সংকট নয়; এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা।
◆ দমননীতি কেন ব্যর্থ: মাথা কাটবেন কোথায়?
ঐতিহ্যবাহী দমননীতির ছক সহজ: আন্দোলনের নেতাকে চিহ্নিত করো, গ্রেপ্তার করো, ভয় দেখাও কিংবা দরকষাকষিতে টেনে এনে আন্দোলনকে ভেতর থেকে দুর্বল করো। কিন্তু যে আন্দোলনের কোনো একক কেন্দ্র নেই, সেখানে এই ছক কাজ করে না। হ্যাশট্যাগ, মিম আর গ্রুপ চ্যাট সেখানে নেতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। একজন ধরা পড়লে দশজন তাঁর জায়গা নেন। বরং দমন-পীড়ন প্রায়ই আন্দোলনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ভারতে লাঠিচার্জের পর আন্দোলন নতুন নতুন শহরে ছড়িয়েছে; নেপালে সামাজিক মাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্তই ছিল বিস্ফোরণের ফুলকি।
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। এসব আন্দোলন আক্ষরিক অর্থে নেতৃত্বহীন নয়; ভারতে অভিজিৎ দিপকে আছেন, ফ্রান্সে লিসেয়েনদের তিনটি সংগঠন, ইউনিয়ঁ সিন্ডিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) সহ, শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেছে। বলা ঠিক হবে, নেতৃত্ব আছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র নেই; সিদ্ধান্ত ও অংশগ্রহণ ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের হাতে। সেই কারণেই ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে ‘লা ফ্রঁস আঁসুমিস’কে দায়ী করার চেষ্টা যেমন আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে অস্বীকার করে, তেমনি তা বোঝায় যে পুরনো রাজনৈতিক ছাঁচে নতুন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা এখনো প্রবল।
আরেকটি কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও মনস্তত্ত্বেও লুকিয়ে আছে। একজন নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষ না থাকলে ‘শত্রু’ চিহ্নিত করা যায় না, আর শত্রুহীন সংঘাতে বল প্রয়োগ প্রায়ই নিরীহ মানুষকে আঘাত করে, যা সরকারের নৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশে দেখা গেছে, বল প্রয়োগ ও রক্তপাতের পর ক্ষমতাসীনদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আরও বেড়েছে। দমননীতি তাই এখন কেবল অকার্যকর নয়, অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল দেয়।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিকা চেনোয়েথ ও তাঁর সহগবেষক মারিয়া স্টিফান ১৯০০ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যকার ৩২৩টি প্রতিরোধ আন্দোলন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের হার ৫৩ শতাংশ, সহিংস আন্দোলনের ২৬ শতাংশ। তাঁদের বহুল আলোচিত ‘৩.৫ শতাংশ নীতি’ বলে, শীর্ষ মুহূর্তে জনসংখ্যার এই অংশ রাস্তায় নামলে তাঁদের বিশ্লেষিত কোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। চেনোয়েথ নিজেই অবশ্য সতর্ক করেছেন, এটি ‘লৌহকঠিন নিয়ম’ নয়, ‘অভিজ্ঞতালব্ধ সূত্র’ মাত্র।
◆ প্রযুক্তির সীমা: গতি আছে, গভীরতা কোথায়?
তবে প্রযুক্তি-নির্ভর আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য ভাবলে ভুল হবে। চেনোয়েথ নিজেই লক্ষ করেছেন, ২০১০ সালের পর থেকে অহিংস ও সশস্ত্র, উভয় ধরনের প্রতিরোধ আন্দোলনের সাফল্যের হার কমছে, যদিও আন্দোলনের সংখ্যা বেড়েছে। কারণ, সরকারগুলোও খাপ খাইয়ে নিচ্ছে: ইন্টারনেট বন্ধ, নজরদারি, অপপ্রচার আর নির্বাচিত গ্রেপ্তারের কৌশলে।
প্রযুক্তি ও সামাজিক আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করা তুর্কি-মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী জেইনেপ তুফেকচি তাঁর ‘টুইটার অ্যান্ড টিয়ার গ্যাস’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন, ডিজিটাল মাধ্যম আন্দোলনকে অতি দ্রুত বিশাল করে তোলে, কিন্তু অতীতের আন্দোলনগুলো দীর্ঘ সংগঠনের মধ্য দিয়ে যে সাংগঠনিক সামর্থ্য, অর্থাৎ দরকষাকষি, কৌশল বদল ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করত, তা এখানে অনুপস্থিত থাকে। ফলে রাস্তা দখল করা সহজ, কিন্তু রাষ্ট্র গড়ার টেবিলে বসার প্রস্তুতি দুর্বল থেকে যায়।
নেপালের অভিজ্ঞতা এর প্রমাণ। অস্থিরতার মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তত ১৩ হাজার বন্দি কারাগার থেকে পালিয়ে যায়, আর আন্দোলনের সুযোগে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটও ঘটে। নেতৃত্বের শূন্যস্থান কেবল স্বাধীনতা নয়, ঝুঁকিও তৈরি করে। কে আন্দোলনের পক্ষে কথা বলবে, কে সুযোগসন্ধানী, তা আলাদা করা কঠিন। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও শিক্ষা একই: সরকার পতন তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু তার পর ঘোষিত প্রত্যাশা বাস্তবায়নের কাঠামো না থাকলে সেই জনরোষই নতুন হতাশায় রূপ নেয়।
◆ জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি: আকাঙ্ক্ষা না বোঝার মূল্য
নেতৃত্ব বদলের এই ধারার পেছনে আরেকটি গভীর কারণ প্রায়ই আলোচনার আড়ালে থেকে যায়: জনসম্পৃক্ততা ও জনস্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতির কারণে রাজনীতিবিদেরা সাধারণ মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষাই আর বুঝতে পারছেন না। যিনি মাঠের মানুষের কাছ থেকে দূরে, তাঁর কাছে বেকার তরুণের হতাশা কেবল একটি পরিসংখ্যান; ভাঙা স্কুলঘর কেবল বরাদ্দের ফাইল; প্রশ্নফাঁসে ঝরে যাওয়া স্বপ্ন কেবল ‘আইনশৃঙ্খলার’ বিষয়। ক্ষমতার বলয়ে বন্দি নেতারা যখন দলীয় হিসাব-নিকাশ আর স্বার্থের সমীকরণে ব্যস্ত, নাগরিকের প্রকৃত প্রত্যাশা তখন তাঁদের কানে পৌঁছায় না। ভারতে ক্ষমতার কাঠামোর শীর্ষ থেকে উচ্চারিত একটি মন্তব্য যে কত দ্রুত লাখো তরুণের ক্ষোভে রূপ নিল, তা এই দূরত্বেরই প্রমাণ। এই না-বোঝার ফাঁক ভরাট করতেই মানুষ এখন নিজেরাই নিজেদের কণ্ঠ হয়ে উঠছে।
জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের আরেকটি পরিণতি জনগণের ভেতরে গড়ে ওঠা বিকল্প প্রক্রিয়া। যে নেতৃত্ব মানুষের কাছে নেই, মানুষ তার কাছে সমস্যা জানায় না, ভরসাও করে না। তথ্য, সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তার জন্য মানুষ তখন পরস্পরের ওপর নির্ভর করতে শেখে, যা এডেলম্যানের ‘আস্থা সমপর্যায়ে সরে যাচ্ছে’ পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও মেলে। একদিকে এতে জন্ম নেয় অনলাইন সংহতি, অন্যদিকে সেই ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে অপরাধী ও সুযোগসন্ধানী চক্র। তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানতেই পারে না সমাজে কারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িত, কোথায় অসন্তোষ জমছে, কোথায় সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে জনগণের কাছে কোনো আগাম সতর্কতা বা বার্তা পৌঁছায় না, আবার দুষ্ট প্রকৃতির অপরাধীদের সম্পর্কে নেতৃত্বের কাছেও কোনো তথ্য থাকে না। অপরাধ মোকাবিলা তখন হয় ঘটনার পরে, প্রায়ই অতিরিক্ত বল প্রয়োগে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। নেপালে বিক্ষোভের মধ্যে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও কারাগার থেকে বন্দি পালানোর ঘটনা দেখিয়েছে, জনমানসের খবর ও অপরাধী নেটওয়ার্কের তথ্য না থাকলে রাজনৈতিক সংকট কত দ্রুত আইনশৃঙ্খলার সংকটে গড়ায়। ফ্রান্সেও শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্যে শতাধিক লিসে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে; আন্দোলনের ন্যায্য দাবি আর সহিংস ঘটনাকে আলাদা করে চিনতে পারা সেখানেও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তথ্যশূন্যতা ও অনিশ্চয়তাই একের পর এক দেশকে অস্থির করে তুলছে।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। ধরা যাক, বিদ্যমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ সত্যিই নিজেদের ভুলত্রুটি অনুধাবন করলেন এবং নিজেদের শোধরাতে চাইলেন। কিন্তু নতুন ধারার আন্দোলন যে গতিতে, যে ভাষায়, মিম, হ্যাশট্যাগ, ডিসকর্ড, আর যে বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোয় এগোচ্ছে, তার সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধনের সুযোগ তাঁরা কি আদৌ পাবেন? যে আন্দোলন কয়েক সপ্তাহে কোটি কোটি অনুসারী জোগাড় করে, কয়েক দিনে সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়, সেখানে ধীরগতির আত্মসমালোচনা ও দলীয় সংস্কারের জন্য যথেষ্ট সময় কি অবশিষ্ট থাকবে? সংশোধিত হয়ে ফিরলেও নতুন প্রজন্ম কি তাঁদের আর বিশ্বাস করবে, নাকি ‘দেরিতে আসা অনুতাপ’ বলে ফিরিয়ে দেবে? আর সেই সংশোধন যদি কেবল কৌশল হয়, ডিজিটাল প্রজন্মের তীক্ষ্ণ নজরে তা ধরা পড়তে কতক্ষণ লাগবে?
◆ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সামনে নতুন গবেষণা-কৌশল
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে নিজের তত্ত্বকাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে। আমার মতে অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে জরুরি গবেষণা প্রয়োজন। প্রথমত, ‘বিতরিত নেতৃত্ব’ বা ডিস্ট্রিবিউটেড লিডারশিপের তাত্ত্বিক রূপরেখা; নেতার অনুপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়, তা বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদম কীভাবে ক্ষোভকে সংগঠিত বা বিকৃত করে, ইন্টারনেট বন্ধ আসলে আন্দোলন থামায় না বাড়ায়, সেই অনুসন্ধান। তৃতীয়ত, চেনোয়েথ-স্টিফানের ডেটাসেটের মতো তথ্যভান্ডারে এই নতুন প্রজন্মের আন্দোলন যুক্ত করে তুলনামূলক বিশ্লেষণ। চতুর্থত, আন্দোলন থেকে প্রতিষ্ঠানে উত্তরণের পথ: কীভাবে রাস্তার শক্তি নির্বাচন, সংস্কার ও জবাবদিহির কাঠামোয় রূপ নেয়।
পঞ্চমত, প্রবাসী সম্প্রদায়ের ভূমিকাও গবেষণার দাবি রাখে। ভারতের আন্দোলনে বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের সংহতি-সমাবেশ, বাংলাদেশের জুলাইয়ে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ, এসবই ইঙ্গিত দেয়, আন্দোলনের ভৌগোলিক সীমারেখা আজ অনেকটাই ঝাপসা। রেমিট্যান্স ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের পথ ধরে যে প্রবাসী নেটওয়ার্ক দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, সেই একই নেটওয়ার্ক এখন দেশের রাজনীতির অদৃশ্য অংশীদার হয়ে উঠছে। তাই জাতিরাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে বন্দি তত্ত্ব দিয়ে এই নতুন বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের জন্যও বার্তা স্পষ্ট। এডেলম্যানের ২০২৬ সালের জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা চেয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যেন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দোষারোপ বা হেয় করার ভাষা এড়িয়ে চলেন। বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধনের জবাবে যে একটি পরিহাসই লাখো মানুষকে একসূত্রে বেঁধেছে, তা শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। দমন নয়, শোনাই এখন আস্থা ফেরানোর একমাত্র পথ।
মানুষ যখন কথা বলার জায়গা পায় না, তখন সে কথা বলার নতুন জায়গা তৈরি করে নেয়; আজ তা পর্দার ভেতরে, কাল রাজপথে। নেতার মুখ না থাকলেও আন্দোলনের একটি চেহারা আছে: কর্মসংস্থানহীন তারুণ্যের, ভাঙা স্কুলঘরের, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের আর অবহেলিত নাগরিকের চেহারা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই চেহারা চিনতে প্রস্তুত? রাজনীতিবিদেরা কি জনসম্পৃক্ততার পুরনো প্রতিশ্রুতি নতুন করে পূরণ করবেন, নাকি পরবর্তী ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করবেন? আর গবেষকেরা কি সময় থাকতেই বুঝে নিতে পারবেন, প্রযুক্তির এই গতি কীভাবে স্থায়ী গণতান্ত্রিক সংস্কারে রূপ নেবে?
লেখক: মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক, ফ্রান্স
