ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা লড়াই ‘এল ক্ল্যাসিকো’র দিন ঘনিয়ে আসছে। যতই সময় গড়াচ্ছে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্যকার দ্বৈরথ ঘিরে উত্তেজনার পারদ ততই চড়ছে। শতবছরের পুরোনো এই দ্বৈরথ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। রোববার ন্যু ক্যাম্পে জয়ের ঝান্ডা উড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নামবে দুই।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা দ্বৈরত নিয়ে একটি বিস্তারিত নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইতিহাসে মোড়ানো এই চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
কখন শুরু হয়েছিল এল ক্ল্যাসিকো দ্বৈরথ?
বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের এই প্রতিদ্বন্দ্বীতার শুরু ১৯০২ সালে। কোপা দেল রের আগের সংস্করণ ‘কোপা দে লা কোরোনাশিয়ন’-এ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। ১৯০২ সালের ১৩ মে মাদ্রিদের লা কাস্তেলিয়ানা হিপোড্রোমে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে রিয়ালকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল বার্সেলোনা।
এরপর আরও ছয়টি ম্যাচের পর অবশেষে ১৯২৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি লা লিগার মঞ্চে মুখোমুখি হয় তারা। রাফায়েল মোরেরা’র জোড়া গোলে সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানের জয় তুলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। সে বছর স্প্যানিশ ফুটবলের শীর্ষ লিগ চালুর পর দুদলের এই তিক্ততা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র রূপ নেয়।
স্প্যানিশ শব্দ ‘এল ক্ল্যাসিকো’ প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে স্থানীয় এক সংবাদপত্র মারফত। তবে তার অনেক আগে থেকেই এই ম্যাচ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় ডার্বি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছিল।
বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে গত দুই দশকে ডাগআউটে পেপ গার্দিওলা বনাম হোসে মরিনহোর মস্তিষ্ক আর মাঠে লিওনেল মেসি বনাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এই দ্বৈরথকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়।
কীভাবে এই দ্বৈরথের সূচনা ও বিবর্তন?
স্পেনের বৃহত্তম দুই শহর মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মূলত লড়াইয়ের সূচনা, যার পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন।
১৯৩০-এর দশকে দুই শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এফসি বার্সেলোনা পরিচিতি পায় কাতালান স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। অন্যদিকে তার তিন বছর পর জন্ম নেওয়া রিয়াল মাদ্রিদ প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে স্প্যানিশ জাতীয়তাবাদের।
রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার এই বৈরিতা ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক অলিগলিতে এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, ক্লাব দুটির সভাপতি নির্বাচন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই পরাশক্তি জড়িয়ে পড়েছে আইনি লড়াই ও কাদা ছোড়াছুড়িতে
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফার কাছে ৫০ হাজার পৃষ্ঠার একটি নথি জমা দেয় রিয়াল মাদ্রিদ। ফুটবলে বহুল আলোচিত ‘নেগরেইরা কাণ্ড’-এর তদন্ত দ্রুত শেষ করার তাগিদেই তারা এই পদক্ষেপ নেয়।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে নিতে স্প্যানিশ ফুটবলের রেফারি কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি হোসে মারিয়া এনরিকেস নেগরেইরার মালিকানাধীন সংস্থাকে কোটি কোটি ডলার দিয়েছিল বার্সেলোনা।
অন্যদিকে গত সোমবার বার্সেলোনা সভাপতি জোয়ান লাপোর্তা তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ তোলেন যে, রিয়াল মাদ্রিদ ‘ক্রমাগত লা লিগার ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে’।
রিয়াল মাদ্রিদের অভ্যন্তরীণ পরিচালন নীতিকে জার্মানির নাৎসি পার্টির প্রচার কৌশলের সাথে তুলনা করেছিলেন লা লিগা প্রধান ও রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার তেবাস। তার এমন বিতর্কিত মন্তব্যের পর তেবাসের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে রিয়াল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কার আধিপত্য?
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের সামগ্রিক রেকর্ড একেবারে সমানে সমান। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ- উভয় দলই ১০৬টি করে ম্যাচে জয় পেয়েছে, আর ড্র হয়েছে ৫২টি ম্যাচ।
তবে গত পাঁচ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় লড়াইটা হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি- যেখানে বার্সার ১০ জয়ের বিপরীতে রিয়ালের জয় ৯টিতে।
আবার সবশেষ ১০টি ক্ল্যাসিকোর পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায় কিছুটা এগিয়ে বার্সেলোনা, যেখানে ৬টিতে জিতেছে কাতালানরা আর ৪টিতে জয় পেয়েছে রিয়াল।
রোববারের এল ক্ল্যাসিকোয় ফেভারিট কারা?
চলতি মৌসুমে লিগ টেবিলের পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষে থাকায় রোববারের ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে বার্সেলোনা।
চলতি লা লিগায় টানা নয় ম্যাচের নয়টিতেই জয় তুলে নিয়েছে বার্সা। অন্যদিকে দুটি ম্যাচ হেরে বার্সেলোনার চেয়ে ৬ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে টেবিলের তিন নম্বরে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।
রোববারের ম্যাচে বার্সেলোনা জিতলে তা হবে এল ক্ল্যাসিকোয় তাদের টানা দ্বিতীয় জয়। এর আগে গত বছরের ১০ মে ২-০ ব্যবধানে রিয়ালকে হারিয়েছিল তারা।
কাতালানদের জন্য সেই জয়টি ছিল বিশেষ কিছু। কারণ ওই জয়ের মধ্য দিয়েই তারা লিগ শিরোপা ধরে রাখা নিশ্চিত করেছিল। আর লা লিগার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সরাসরি এল ক্ল্যাসিকোর ফলের ওপর ভিত্তি করে লিগ শিরোপা নির্ধারণের ঘটনা ইতিহাসে এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো।
সূত্র: আলজাজিরা।
