জুলাই বিপ্লবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসসি বিভাগের শিক্ষার্থী মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। পুলিশ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলার মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। এই সময়ে কয়েকশ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার পাশাপাশি কেবল ১৯ জুলাই ৩০-৪০ জন শহীদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আড়াল করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ইন্টারনেট বন্ধ করে দেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মেজবাহর জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে।
বিজ্ঞাপন
জুলাই বিপ্লবে ইন্টারনেট বন্ধ করে সারাদেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে ১১তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমার বর্তমান বয়স ২২ বছর। আমার জেলা নোয়াখালী। বর্তমানে মালিবাগে থাকি। জুলাই আন্দোলনে আমি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলাম। ১৪ জুলাই হাসিনা ছাত্রছাত্রীদের রাজাকারের নাতিপুতি বলে আখ্যা দেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরদিন ১৫ জুলাই ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও তারা হামলা চালায়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ঢাবি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতে পলক ফেসবুকে পরপর তিনটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘যারা নিজেদেরকে রাজাকার বলে স্লোগান দিয়েছে, তাদের কি এরকম বলতে লজ্জা করে না?’ তার পরবর্তী পোস্ট ছিল, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি, বাঙালি; তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।’ শেষে তিনি লেখেন, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার।’ এবং রাজাকার স্লোগান দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের বাংলাদেশ ছাড়ার কথা লেখেন তিনি।
জবানবন্দিতে মেজবাহ বলেন, পলকের পোস্ট ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই আমরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করি। ওই দিন বাসায় ফিরে জানতে পারি, সারাদেশে রংপুরের আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে। পরে ১৮ জুলাই আমরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কর্মসূচিতে পুলিশ আমাদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ শুরু করে। পরে পুলিশ রাবার বুলেট এবং শটগান দিয়ে গুলি করতে থাকে। তাদের আক্রমণে ছাত্রছাত্রীরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে গেট বন্ধ করে দিলে পুলিশ গেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গুলি করতে থাকে এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। ওই দিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থী আহত হন। আমার বন্ধু জিসানের চোখে ছররা গুলি লেগেছিল এবং পরে তার চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ওই দিন দেখি আমাদের মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট কাজ করছে না। তখন আমরা বুঝতে পারি, সরকারের নির্দেশে এটা করা হয়েছে। ইন্টারনেট না থাকায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ১৯ জুলাই আমি উত্তর বাড্ডা মেইন রোডে আন্দোলনে যোগ দিই। সেখানে পুলিশ ও বিজিবির সহায়তায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। ওই হামলায় রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় ৩০-৪০ জন মানুষ শহীদ হন। এভাবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র আক্রমণে প্রায় ১,৪০০ মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ২৫,০০০ মানুষ আহত হন।
জবানবন্দিতে এই জুলাইযোদ্ধা বলেন, হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর পলক ও সালমান এফ রহমানের মধ্যে ফোনালাপের মাধ্যমে জানতে পারি, হাসিনার নির্দেশে, তার ছেলে জয়ের পরামর্শে প্রতিমন্ত্রী পলক ইন্টারনেট বন্ধ করেন। আমি হাসিনাসহ আসামিদের বিচার চাই।
