আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নতুন করে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই নতুন ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সাইডলাইন বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সেখানে সংস্কার উদ্যোগগুলোর বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও আগের মতোই কঠোর কিছু শর্ত যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। ব্যাংককের বৈঠকেও এ নিয়ে অগ্রগতি জানতে চেয়েছে বলে জানা গেছে। আগের ঋণ কর্মসূচির মতো এবারও আইএমএফের একই শর্ত তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না।
রাজস্ব খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য পুরোনো ঋণ কর্মসূচিতে বেশ কিছু শর্ত ছিল।
এর মধ্যে অন্যতম হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়—এই দুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগে বিভক্ত করা। পুরোনো ঋণ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া শর্ত অনুসারে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল।
বর্তমান সরকার এই বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল, যারা ইতিমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মতে, মানুষের হয়রানি কমাতে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে এ ধরনের বিভাজন অপরিহার্য। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, এনবিআর তখন একটি আলাদা বিভাগ হিসেবে সরাসরি কাজ করবে এবং মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করবে, অন্যদিকে আলাদা বিভাগ থেকে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা হবে। বিশ্বজুড়ে অনেক উন্নত দেশেই এই মডেলে রাজস্ব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করবে।
এনবিআরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আইএমএফ একক মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ ধরনের ভ্যাট হার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫ ও ০ শতাংশ উল্লেখযোগ্য। এনবিআর একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন হ্রাসকৃত ভ্যাট হারগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া। ২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার কার্যকর করার লক্ষ্য থাকলেও, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এটি সাড়ে ৭ শতাংশ করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে বেশির ভাগ পণ্য ও সেবায় ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ।
কর ছাড় কমানো নিয়ে আইএমএফের আগের শর্তের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে নতুন আলোচনায়। ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরনের অযৌক্তিক কর ছাড় বাদ দেওয়ার শর্ত রয়েছে। তবে এনবিআরের বর্তমান অবস্থান হলো, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের স্বার্থে পুরোপুরি কর ছাড় বন্ধ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি, রাজস্ব খাতে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে উভয় পক্ষই ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজস্ব খাতে সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব আনা কঠিন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কর ছাড় কমিয়ে আনা এবং নীতি ও আদায় কার্যক্রম আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যেখানে এই হার মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধিও আশানুরূপ নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে দ্রুত এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। রাজস্ব খাত সংস্কার উদ্যোগে গতি এসেছে। এসব সংস্কার করতেই হবে, যত দ্রুত করা যায়, ততই ভালো।
The post নতুন ঋণে আইএমএফের পুরোনো শর্ত: রাজস্ব সংস্কারে কতদূর বাংলাদেশ? appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
