শহরের আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য ও জীবনধারা। সেই ঐতিহ্য নান্দনিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে কিশোরগঞ্জের একটি দুর্গাপূজা মণ্ডপে।
মাটির ঘর, ধান মাড়াই, ঢেঁকিতে ধান ভাঙা থেকে শুরু করে কুমোরের মৃৎশিল্প- সবই দেবী দুর্গার পাশে স্থান পেয়েছে মণ্ডপে। জেলা শহরের বত্রিশ এলাকার গঙ্গা সাগর দেব সরকার বাড়িতে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের।
ঢেঁকিতে ধান ভাঙার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপে
বর্ণাঢ্য মঞ্চ, মঞ্চঘিরে আলোর খেলা এই সবের মাঝে দেবী দুর্গার অবস্থান। মণ্ডপের দু’পাশে কৃষক-কৃষাণীর ধান মাড়াই, পলো দিয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য এবং কামার-কুমোরের কর্মব্যস্ততা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এবার এই মণ্ডপে পূজার থিম রাখা হয়েছে পল্লীকথা।
পরিবারের সঙ্গে এই মণ্ডপে আসা মৃত্তিকা দেবনাথ বলেন, “আমি কখনো এমন থিম দেখিনি। আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। কারণ বর্তমান প্রজন্ম যারা কখনো আমাদের গ্রামবাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দেখেনি, তাদের জন্য আমি বলব এটিই সেরা। এখানে একটি গ্রামের প্রায় সব কিছু দারুণভাবে ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে। ”
অনুপম সাহা গঙ্গা সাগর দেব সরকারের বাড়ির মণ্ডপে দেখে বলেন, সাধারণত এমন ধরনের থিম নিয়ে পূজামণ্ডপগুলো আমরা বিভাগীয় শহর বা কলকাতার মতো জায়গায় দেখতে পাই। কিন্তু এখানে এসে আমি এক কথায় মুগ্ধ। বাচ্চাদের শেখানোর অনেক বিষয় এখানে রয়েছে। এক কথায় চোখের সামনে জীবন্ত একটি গ্রাম দেখতে পেলাম।
পলো দিয়ে জেলের মাছ ধরতে যাওয়া এবং জ্বালানি হিসেবে গোবর শুকানোর দৃশ্য
মণ্ডপের নান্দনিক কারুকাজ, দূর্গার পাশে বাংলার লোকজ আবহের অকৃত্রিম পরিবেশ নিয়ে আলোচনা এখন পুরো শহরে। পূজার প্রধান উদ্যোক্তা গৌতম সরকারের ভাবনায়
এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মের সামনে। শুধু মণ্ডপসজ্জা নয়, এর প্রতিটি অনুষঙ্গে রয়েছে বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনসংগ্রাম, শ্রম আর লোকজ সংস্কৃতির গল্প। তাই প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি এই মণ্ডপ হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষের বাড়তি আকর্ষণ।
সরকার বাড়ির পূজার প্রধান উদ্যোক্তা গৌতম সরকার বলেন, বর্তমান প্রজন্ম সত্যিকার অর্থে গ্রামবাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য জানতেই পারেনি। তারা বড় হচ্ছে শহরের একটি আবদ্ধ জায়গায়। গ্রাম কী, ঐতিহ্য কী, আমাদের প্রজন্ম কী দেখে বড় হয়েছি আর বর্তমান প্রজন্ম কী হারিয়েছে বা হারাচ্ছে সেটি বুঝানোই ছিল মূল উদ্দেশ্যে।
বাঁশের তৈরি ঝুড়ি তৈরি করছেন এক ব্যক্তি
দুর্গাপূজোয় একসাথে বিভিন্ন পরিবার ঘুরতে আসবে, তাদেরকে হারিয়ে যাওয়া গ্রামের সেই চিরচেনা প্রতিচ্ছবিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আমাদের একমাত্র প্রয়াস।
নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যাওয়ার বার্তাই দিচ্ছে কিশোরগঞ্জের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার এই প্রয়াস যেন মনে করিয়ে দেয়- ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, তা বাঙালির আত্মপরিচয়েরও অংশ।
