পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইট কতটা নিরাপদ এবং সম্ভাব্য সাইবার হামলা মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় পোর্টাল ব্যবস্থার আওতায় থাকা প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০টি ওয়েবসাইট পিএইচপিতে তৈরি নয়। তবে এর বাইরে থাকা সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত সার্ভার-সাইড প্রোগ্রামিং ভাষা। ওয়েবসাইটের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, ডেটাবেজ পরিচালনা, ব্যবহারকারীর লগইন যাচাই এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা চালাতে এটি ব্যবহৃত হয়। ওয়ার্ডপ্রেসের মতো জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাও পিএইচপিনির্ভর। ফলে এই ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটি বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ওয়েবসাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ পিএইচপিতে দুটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত করেছে। ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা দূর থেকে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারে। এতে সার্ভারে থাকা ফাইল, ডেটাবেজ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ ধরনের আক্রমণ ঠেকাতে শুধু শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার যথেষ্ট নয়; সার্ভারের সফটওয়্যারও নিরাপদ সংস্করণে হালনাগাদ রাখতে হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সে স্থানীয় প্রশাসনের বেশ কিছু ওয়েবসাইট, নেদারল্যান্ডসে ডিজিটাল পরিচয় যাচাই সেবা ডিজিডি ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট এবং বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে অফলাইনে রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারের অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় থাকা প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০টি ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি নয়। ফলে পিএইচপির এই নির্দিষ্ট ত্রুটির কারণে এসব ওয়েবসাইট সরাসরি আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশের সব সরকারি ওয়েবসাইট ঝুঁকিমুক্ত।
এটুআইয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সতর্কতার পর তাঁদের সাইবার নিরাপত্তা দলকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যদিকে, জাতীয় পোর্টাল ব্যবস্থার বাইরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। সেগুলোতে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতেও পিএইচপির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ওয়েবসাইট হোস্টিং প্রতিষ্ঠান লিমডা হোস্টের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা জুনাইদ মিয়াজী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের গ্রাহকদের প্রায় ৮০ শতাংশের ওয়েবসাইট পিএইচপিভিত্তিক। নিরাপত্তা ত্রুটির খবর পাওয়ার পর তাঁরা দ্রুত সার্ভারে সংশোধিত প্যাচ প্রয়োগ করেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁদের ব্যবস্থায় এ ত্রুটির কারণে কোনো প্রভাব শনাক্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথমেই সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভারে পিএইচপির কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার তালিকা তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেটে সরাসরি উন্মুক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণকারী সার্ভারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা হালনাগাদ নিশ্চিত করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা প্রথম আলোকে বলেন, ঝুঁকিতে থাকা সার্ভারগুলো চিহ্নিত করে সংশোধিত সংস্করণে হালনাগাদ করা জরুরি। হালনাগাদ করার আগপর্যন্ত ফায়ারওয়াল ব্যবহার করে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কোনো সার্ভার তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে সেটিকে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
এদিকে, সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টও এ বিষয়ে সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে তাদের সার্ভার ও ওয়েবসাইটে কোথায় কোথায় পিএইচপি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা শনাক্ত করতে হবে। এরপর ব্যবহৃত সংস্করণগুলো ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট অপারেটিং সিস্টেম ও পিএইচপি সংস্করণের উপযোগী নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করতে হবে।
তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে ইন্টারনেট থেকে প্রবেশাধিকার সীমিত করা, নির্দিষ্ট আইপি ঠিকানা থেকে সংযোগের অনুমতি দেওয়া এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মতো সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। হালনাগাদের পর সংশোধনটি কার্যকর হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের ওয়েবসাইটগুলো পিএইচপিনির্ভর না হওয়ায় একটি নির্দিষ্ট ঝুঁকি থেকে সেগুলো সুরক্ষিত থাকতে পারে। তবে দেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সব গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটের প্রযুক্তিগত কাঠামো যাচাই, দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কারণ, একটি ওয়েবসাইট নিরাপদ থাকলেই পুরো দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
