বাঁচার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি। দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে বছর কেটে গেলেও উদ্ধারের কোনও সম্ভাবনাই দেখছিলেন না। ৪৯১ দিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার পর উদ্ধার করা হল ইউক্রেনীয় সেনা কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেঙ্কোকে। ৪৯ বছরের এই ইউক্রেন সেনা সংবাদমাধ্যম সেন্সর ডট নেট-কে শোনালেন তাঁর বেঁচে ফেরার লড়াইয়ের কাহিনি।
ইউক্রেনের ৩০ মেকানাইজ়ড ব্রিগেডের সেনাকর্মী ভ্লাসেঙ্কো। যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পাথরখাদানের ট্রাক চালাতেন। স্বেচ্ছায় সেনায় যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পর গত বছর তাঁকে ফ্রন্টলাইন পজিশন ভার্টুনে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর সহযোদ্ধা ছিলেন বছর পঞ্চাশের বাস্কি। তাঁরা একটি বাঙ্কার থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ড্রোনের মাধ্যমে তাঁদের দু’জনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল। এ ভাবে বেশ কিছু দিন কাটে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে প্রবল বৃষ্টির কারণে বাঙ্কার জলে ভরে যায়। উপায় না দেখে একটি ভাঙা এবং পরিত্যক্ত স্কুলে আশ্রয় নেন।
ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, ‘‘এক দিন হঠাৎ দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে রুশ ড্রোন এগিয়ে আসছে। তার পর ওই স্কুল লক্ষ্য করে হামলা শুরু হল।’’ তিনি জানান, কোনও রকমে ওই স্কুল ছেড়ে শিয়ালের একটি গর্তে আশ্রয় নেন। ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে সাময়িক ভাবে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্ধারের জন্য দু’জন সেনাকে পাঠানো হয়। কিন্তু ড্রোন হামলায় তাঁদের মৃত্যু হয়। সেই দেহ আনতে গিয়ে আরও দুই সেনার মৃত্যু হয় রুশ হামলায়। ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, ‘‘আর বাঁচার কোনও উপায় দেখছিলাম না। আশা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছিল।’’
তাঁরা কোনও রকমে আবার সেই পরিত্যক্ত স্কুলে ফিরে আসেন। সেখানে তাঁদের ড্রোনের মাধ্যমে শুকনো খাবার, পোশাক পাঠানো হচ্ছিল। বেশ কিছু দিন এ ভাবে চলার পর রুশ নজরদারি ড্রোনের নজরে আসে ঘটনাটি। তার পর আবার শুরু হয় ড্রোন হামলা। ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, ‘‘সেই হামলায় আমার সহযোদ্ধা বাস্কির মৃত্যু হয়। গুরুতর জখম হয় আমার বাঁ পা। পালাতে গিয়ে ডান পায়েও আঘাত লাগে।’’ কিছু দিন আবার হামলা বন্ধ ছিল। কিন্তু সর্ব ক্ষণ ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছিল রুশ সেনা। এক দিন হঠাৎ একটি রুশ ড্রোন থেকে লাউডস্পিকার ফেলা হয় স্কুলের সামনে। সেই লাউডস্পিকারে বলা হয়, ‘‘আপনি যে এখানে লুকিয়ে আছেন, আমরা তা জানি। কেউ বাঁচাতে পারবে না আপনাকে।’’ এ ভাবেই স্কুলে কয়েক মাস কেটে যায়। প্রতি চার-পাঁচ দিন অন্তর ড্রোনের মাধ্যমে খাবার, ওষুধ পাঠানো হত। ভ্লাসেঙ্কোর কথায়, ‘‘তখন মনে হত, আমি বেঁচে আছি।’’
ড্রোন হামলা থেকে বাঁচলেও অন্য একটা সমস্যা বাড়ছিল ক্রমশ। ড্রোন হামলায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া ভ্লাসেঙ্কোর বাঁ পা পচে গিয়েছিল। ডান পায়েও পচন ধরেছিল। অসহ্য যন্ত্রণা। সংক্রমণ যাতে সারা শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে, শেষমেশ নিজের হাতেই ডান পায়ের একটি অংশ কেটে ফেলেন ছুরি দিয়ে। ইউক্রেন সেনা ভ্লাসেঙ্কোকে উদ্ধারের জন্য লাগাতার চেষ্টা করে গিয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনও সেনা বা ট্যাঙ্ক পাঠানো সহজ ছিল না। কারণ রুশ ড্রোন সর্ব ক্ষণ নজরদারি চালাচ্ছিল। রোবোটিক গাড়ি পাঠিয়েও ভ্লাসেঙ্কোকে উদ্ধারের চেষ্টা হয়। কিন্তু সেটিও ধ্বংস করে রুশ সেনা।
শেষে ভ্লাসেঙ্কোকে অন্য উপায়ে উদ্ধারের কৌশল নেওয়া হয়। বড় ড্রোনের মাধ্যমে তাঁকে উদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া। এমন ড্রোন যা ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে সক্ষম। ভ্লাসেঙ্কোকে পরিকল্পনা মতো আগেই ছোট ছোট ড্রোনের মাধ্যমে উদ্ধারের সরঞ্জাম পাঠানো হয়। কী ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে তার একটা প্রশিক্ষণ ভিডিয়োও পাঠানো হয়েছিল। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ হাজির হয় ৪ অক্টোবর। বড় একটি ড্রোন পাঠানো হয়। সেটিকে ঘিরে ছিল হামলাকারী আরও কয়েকটি ড্রোন। ভ্লাসেঙ্কোর কাছে সঙ্কেত পৌঁছোতেই তিনি প্রস্তুত হন। ঝটপট ড্রোনের হারনেসের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে নেন। তার পর তাঁকে সেই ড্রোন নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। ৪৯১ দিন পর উদ্ধার করা হয় ভ্লাসেঙ্কোকে।
