শারজার মাঠে নামার আগে বাংলাদেশের সামনে ছিল কঠিন এক হিসাব। শুধু আফগানিস্তানকে হারালেই চলবে না, ফাইনালে উঠতে হলে জয়ের ব্যবধানও হতে হবে বড়। সেই সমীকরণ মেলাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের সামর্থ্যের পরীক্ষাতেই ব্যর্থ হলো বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে বিপর্যয়, বল হাতে নিষ্প্রভতা-সব মিলিয়ে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অসহায় আত্মসমর্পণ করে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন শেষ হলো লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের।
টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েও শুরু থেকেই পথ হারায় বাংলাদেশ। প্রথম সাত ওভারের মধ্যেই ২৮ রানে চার উইকেট হারিয়ে দল পড়ে যায় গভীর সংকটে। তখন ৪১ রানের ব্যবধানে জয়ের স্বপ্ন দেখার চেয়ে সম্মানজনক সংগ্রহ গড়াই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু গত রাতে ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন শট নির্বাচন আর উইকেটে টিকে থাকার ব্যর্থতায় সেই লক্ষ্যও পূরণ হয়নি পুরোপুরি।
ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৬০ রান যে কোনো বিচারেই অপর্যাপ্ত পুঁজি। শুরুর বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের ইনিংস আরও আগেই গুটিয়ে যেতে পারত। তবে পঞ্চম উইকেটে সাইফ হাসান ও পারভেজ হোসেনের ৯৩ রানের জুটি দলকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। লিটন দাসের বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়া পারভেজই ছিলেন বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ। ৯৬ বলে ৭০ রানের দায়িত্বশীল ইনিংসে তিনি একদিকে যেমন দলের বিপর্যয় সামলেছেন, অন্যদিকে তেমনি বড় সংগ্রহের আশাও বাঁচিয়ে রেখেছিলেন!
কিন্তু এক প্রান্তে পারভেজের লড়াই চললেও অন্য প্রান্তে সাইফের ধীরগতির ব্যাটিং বাংলাদেশের ইনিংসকে প্রত্যাশিত গতি দিতে পারেনি। ৮২ বলে ৪৮ রান করে মোহাম্মদ নবীর বলে আউট হন তিনি। সাইফের বিদায়ের পরের ওভারেই মেহেদী হাসান মিরাজের ফিরে যাওয়া বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দেয়। শেষ পর্যন্ত রশিদ খানের বলে এলবিডব্লু হয়ে পারভেজও যখন সাজঘরে ফেরেন, তখন বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা। ৪০তম ওভারে পারভেজের বিদায়ের পর আর দুই ওভারও টিকতে পারেনি দল।
১৬০ রানের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামা আফগানিস্তানের সামনে তখন জয়ের পাশাপাশি ছিল ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার সুযোগ। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল প্রতিপক্ষকে ১১৯ রানের মধ্যে আটকে রাখা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে ধরনের বোলিং ও ফিল্ডিং দরকার ছিল, তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি বাংলাদেশ।
পাওয়ার প্লের মধ্যে রহমানউল্লাহ গুরবাজ ও সেদিকউল্লাহ আতালকে ফিরিয়ে দিয়ে তাসকিন আহমেদ কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেননি রহমত শাহ। তার অর্ধশতকোচিত ইনিংসে ভর করে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে জয়ের দিকে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার সমীকরণও কার্যত শেষ হয়ে যায়। ২৭তম ওভারেই ১১৯ রান পেরিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়, এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে আর খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের।
শেষ পর্যন্ত ৩৬তম ওভারে ১৬১ রানের লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে আফগানিস্তান। হাতে তখনো বাকি ৮৭ বল, উইকেট হারিয়েছে মাত্র তিনটি। ম্যাচের এমন ফল শুধু পরাজয়ের ব্যবধানই নয়, দুই দলের পারফরম্যান্সের পার্থক্যও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যেখানে আফগানিস্তান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশ কোনো বিভাগেই ধারাবাহিকতার পরিচয় দিতে পারেনি।
অথচ জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ত্রিদেশীয় সিরিজ ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল যথেষ্ট। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলে শিরোপার লড়াইয়ে থাকার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করা দলটি শেষ পর্যন্ত ফাইনালেই উঠতে পারল না। আগামী পরশু ফাইনালে মুখোমুখি হবে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের জন্য পড়ে রইল ব্যর্থতার হিসাব আর একরাশ প্রশ্ন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ব্যাটিং নিয়ে। সিরিজের দুই ম্যাচেই দুই শ রান পার করতে পারেনি বাংলাদেশ। টপ অর্ডারের ব্যর্থতা, মাঝের সারির অনিশ্চয়তা এবং চাপের মুখে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আবারও সামনে এসেছে। পারভেজের মতো একজন ব্যাটসম্যানের লড়াই কিংবা তাসকিনের সাময়িক সাফল্য দলকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট হয়নি। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়েও ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট।
এখন সামনে তাকানো ছাড়া উপায় নেই। আগামী বছর অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপের প্রস্তুতির আগে এই ব্যর্থতা বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকার কথা। সময় খুব বেশি নেই। তাই কেবল হার-জিতের হিসাব নয়, দলের ব্যাটিং কাঠামো, খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপ সামলানোর সামর্থ্য নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। শারজায় ফাইনালের টিকিট হারিয়েছে বাংলাদেশ; এখন বড় প্রশ্ন, বিশ্বকাপের আগে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কাজ কতটা দ্রুত শুরু করতে পারবে দলটি!
