বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন এক মাইলফলক। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া। রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
আজ রোববার বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে রিঅ্যাক্টরটি ক্রিটিক্যাল অবস্থায় পৌঁছায়। নিউক্লয়িার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনপিসিবিএলের নেতৃত্বে পরিচালিত কমিশনিং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় এ গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে।
ড. জায়েদুল হাসান জানান, ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরিমাপকগুলো নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন জানান, বিকেল ৩টায় ৩৪ মিনিটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সব প্যারামিটার চাহিদা অনুযায়ী মাত্রায় আছে। বিকিরণের মাত্রা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের শেষদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন তারা। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএ’র গাইডলাইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের স্টেজ ‘বি ওয়ান’ মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে।
এর আগে, বৃহস্পতিবার দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এই কেন্দ্রের চুল্লির মডেল তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর ১২০০ মডেলের, যেখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে।
ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পরপরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় না। এর আগে অনুমোদিত কমিশনিং কর্মসূচি অনুযায়ী রিঅ্যাক্টর ফিজিক্স পরীক্ষা, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সিস্টেমের কার্যকারিতা যাচাই, নিরাপত্তাব্যবস্থার পরীক্ষা এবং ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি অর্জন শুধু একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমের পর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এ অর্জনের পেছনে এনপিসিবিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলী, অপারেশন ও কমিশনিং বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁরা জানান, ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের পর গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনসহ পরবর্তী প্রতিটি ধাপ সর্বোচ্চ নিরাপত্তামান, অনুমোদিত কারিগরি পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হওয়া বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। তবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর আগে কমিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
