ঢাকা, ২১ অক্টোবর: বিগত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং এক লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন। বিগত সরকারের ভুলনীতি সড়কে দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আজ বুধবার সকালে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বার্তায় সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়কে বেপরোয়া কাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে ত্রিমাত্রিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একচেটিয়াভাবে মানুষের যাতায়াত সড়কে নিয়ে আসায় এমন ভুলনীতি সড়কে দুর্ঘটনা বেপরোয়াভাবে বাড়িয়েছে।
স্বাধীনতার পূর্বে এদেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই পথে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত হতো। সড়কে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত ছিল। তখন সড়ক দুর্ঘটনাও ২০ শতাংশের সীমিত ছিল। স্বাধীনতার পরে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দাতা সংস্থাগুলোর ঋণের জালে আবদ্ধ করার মানসে উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার বেহিসেবী লুটপাট, পরিবহনে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, বহুমাত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে রেল ও নৌপথ সংকুচিত করে একের পর এক নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত সড়কে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকারের দুর্নীতি ও ভুলনীতির ফলে সড়ক দুর্ঘটনাও ৮০ শতাংশ বেড়েছে। তাই সড়কে গণহত্যার দায় অতীতের সব সরকারকে নিতে হবে।
সড়ক সেক্টরে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কতিপয় দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে সড়কের বিশৃঙ্খলা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, লাইসেন্সবিহীন চালক, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়কে নির্মাণ ত্রুটি, মাদকসেবন করে যানবাহন চালানো, বেপরোয়া গতি, অযোগ্য যানবাহনের ফিটনেস প্রদান, অযোগ্য চালকের হাতে লাইসেন্স প্রদান, লাইসেন্সবিহীন-প্রশিক্ষণহীন চালকের হাতে যানবাহন তুলে দেওয়াসহ নানা কারণে বিগত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক যুগের বেশি সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত ও এক লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন। সমিতি শুধুমাত্র গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পেলেও দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে হতাহতের সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি। একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া, ইসরাইল-ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীতে চলমান বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতের সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেশি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নানা খাতে এগিয়ে গেলেও পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিন যাবত দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে নিরাপদ নৌপথ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে একের পর এক সড়ক সম্প্রসারণ, সড়কে বিনিয়োগ বাড়ানো, সড়কের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার অভাবে সড়কের উপর একচেটিয়া চাপ বেড়েছে। সে তুলনায় সড়কে ম্যাস ট্রানজিট বাড়েনি। ডেডিকেটেড বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়নি। উন্নত গণপরিবহনের অভাবে মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তিতে নাভিশ্বাস উঠছে। এহেন ভয়াবহ পরিবহনের সংকট পুঁজি করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি নসিমন-করিমন, পার্শ্ববর্তী দেশের তৈরি মাহিন্দ্রা, পিয়াজিও, পিকআপভ্যানকে লেগুনা হিসেবে বানিয়ে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহারের কারণে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা চরমভাবে বেড়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে সমিতি উল্লেখ করেছে দেশে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বেপরোয়া বৃদ্ধি ও অবাধ চলাচল। সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাঁক সৃষ্টি। মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা। উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
দুর্ঘটনা রোধে সমিতির সুপারিশ, সড়কে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ আমলাদের পরিবর্তে দেশী-বিদেশী পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা জরুরি। সারাদেশে উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা। কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা। মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা। মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা। ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন স্ক্র্যাপ করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা।
সড়ক দুর্ঘটনার এ ভয়াবহ চিত্র দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
