নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা, স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুরক্ষায় অধিদপ্তরের ৩৬টি টিম এ বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে অপরিপক্ব কলা পাকানো, ইউরিয়া ফরমালডিহাইডের ড্রামে ভোজ্যতেল সংরক্ষণ এবং ডাবসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রিতে নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সোমবার ( ১৯ অক্টোবর) ঢাকা মহানগরসহ দেশের ২৮টি জেলায় একযোগে পরিচালিত অভিযানে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কলা এবং অনিরাপদ ড্রামে সংরক্ষিত প্রায় ২০৪ লিটার সয়াবিন তেল জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা, স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুরক্ষায় অধিদপ্তরের ৩৬টি টিম এ বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করে। অভিযানে পাইকারি ও খুচরা বাজার, ফলের আড়ত, ভোজ্যতেলের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কুমিল্লায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
কুমিল্লা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কাউছার মিয়ার নেতৃত্বে আদর্শ সদর উপজেলার স্টেশন রোড ও রেইসকোর্স এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় অপরিপক্ব কলা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে পাকানোর অপরাধে ‘হালিমের কলার আড়ত’কে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কলাগুলো জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়।
অন্যদিকে, ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডাব ও কলার আড়তে অভিযান চালানো হয়। সেখানে কলা পাকানোর রাসায়নিক সংরক্ষণের অপরাধে একটি আড়তকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে সতর্ক করা হয়।
ইউরিয়া ফরমালডিহাইডের ড্রামে সয়াবিন তেল
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটে খোলা ভোজ্যতেলের বাজার তদারকিকালে অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ ড্রামে তেল সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় লেবেল না থাকার অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। এসব অপরাধে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে মেসার্স সততা স্টোরকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ইউরিয়া ফরমালডিহাইডের ড্রামে সংরক্ষিত আনুমানিক ২০৪ লিটার সয়াবিন তেল জনসম্মুখে বিনষ্ট করা হয়। একই অভিযানে হেলাল জেনারেল স্টোরকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
রাজধানীতে চার প্রতিষ্ঠানকে ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা
ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুস সালামের নেতৃত্বে রাজধানীর সাদেক খান কৃষি মার্কেটের ডাবের আড়ত এবং কলেজ গেট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনের ডাবের দোকানগুলোতে বিশেষ তদারকি চালানো হয়। অভিযানে ডাবের সরবরাহ পরিস্থিতি, ক্রয়-বিক্রয়ের মূল্য, পাকা রসিদ সংরক্ষণ এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। এ সময় ক্রয়-বিক্রয়ের পাকা রসিদ সংরক্ষণ না করা, ট্রেড লাইসেন্স না থাকা এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ ও আদায় করা হয়।
কঠোর নজরদারি
দেশব্যাপী অভিযানে ডাব ও কলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্যের বেশি আদায়, হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ও ওষুধ বিক্রি এবং নকল ও ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। এ সময় ব্যবসায়ীদের ফল ও খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক কিংবা নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহার থেকে বিরত থাকা, যৌক্তিক মূল্যে পণ্য বিক্রি, সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত করা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করতে সতর্ক করা হয়। অভিযান চলাকালে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট ও প্যাম্ফলেট বিতরণ করা হয়। তদারকি কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প ও বণিক সমিতির প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেন।
ভোক্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য কেনার আগে মূল্যতালিকা, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং সঠিক ওজন ও পরিমাপ যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কেনাকাটার সময় বিক্রেতার কাছ থেকে রসিদ সংগ্রহের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
পণ্য ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, ভেজাল, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের শিকার হলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ন্যায্যমূল্যে পণ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে দেশব্যাপী এ ধরনের বিশেষ বাজার তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
