প্রোস্টেট ক্যানসার পুরুষদের মধ্যে দেখা দেওয়া অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। প্রোস্টেট হলো মূত্রথলির নিচে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি, যা বীর্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত তরল শুক্রাণুকে পুষ্টি জোগায় ও পরিবহণে সহায়তা করে। পাশাপাশি প্রোস্টেট-নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন (পিএসএ) নামের একটি প্রোটিন তৈরি হয়, যা বীর্যকে তরল রাখতে সাহায্য করে। প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণেও গ্রন্থিটির ভূমিকা রয়েছে।
প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রক্তে পিএসএর মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যানসার ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
প্রোস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ না থাকলেও রোগটি বাড়তে থাকলে কয়েকটি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন:
- প্রস্রাব শুরু করতে বা প্রস্রাবের ধারা অব্যাহত রাখতে অসুবিধা।
- বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
- প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
- প্রস্রাব বা বীর্যের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
- প্রস্রাব বা বীর্যপাতের সময় ব্যথা হওয়া।
- কোমর, নিতম্ব বা শ্রোণি অঞ্চলে ব্যথা।
ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে হাড়ে ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কেন হয় প্রোস্টেট ক্যানসার
প্রোস্টেট ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে প্রোস্টেট গ্রন্থির কোষের ডিএনএতে পরিবর্তন ঘটলে কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে টিউমার তৈরি হয়, যা আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসার শরীরের দূরবর্তী অংশেও ছড়িয়ে যায়।
প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বয়স বাড়ার সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। ৫০ বছরের পর এ রোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়, তবে ৪৫ বছরের আগে এটি তুলনামূলক বিরল। জাতিগত পার্থক্যও ঝুঁকির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
পরিবারের নিকটাত্মীয়ের প্রোস্টেট ক্যানসারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ জিনের বংশগত পরিবর্তন এবং লিঞ্চ সিনড্রোমের মতো কিছু জিনগত অবস্থার সঙ্গে এ রোগের সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, স্থূলতা, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়
প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত করতে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও পারিবারিক ইতিহাস জানতে চান। এরপর রক্তে পিএসএর মাত্রা পরীক্ষা করা হতে পারে। পিএসএর মাত্রা বেড়ে গেলে প্রোস্টেট ক্যানসারের সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু পিএসএর মাত্রা বেশি হলেই ক্যানসার হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।
এ ছাড়া ট্রান্সরেক্টাল আলট্রাসাউন্ড, এমআরআই এবং বায়োপসির প্রয়োজন হতে পারে। বায়োপসিতে প্রোস্টেটের টিস্যুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ক্যানসার নিশ্চিত করা এবং এর ধরন নির্ধারণে এ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের পর্যায়, পিএসএর মাত্রা, কোষের বৈশিষ্ট্য এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার ছোট ও সীমাবদ্ধ থাকলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারে প্রোস্টেট গ্রন্থি অপসারণ কিংবা রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।
হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমে পুরুষ হরমোনের মাত্রা কমিয়ে বা এর কার্যক্রম আটকে ক্যানসারের বৃদ্ধি ধীর করা যায়। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে কেমোথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও ইমিউনোথেরাপিও ব্যবহার করা হতে পারে।
প্রোস্টেট ও অণ্ডকোষ অপসারণ, রেডিওথেরাপি এবং হরমোন চিকিৎসা প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই চিকিৎসার পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই চিকিৎসকের সঙ্গে শুক্রাণু সংরক্ষণসহ সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
নিয়মিত পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রোস্টেট ক্যানসারের পর্যায় নির্ধারণে রোগটি শুধু প্রোস্টেটে সীমাবদ্ধ আছে, নাকি আশপাশের টিস্যু বা দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে, তা বিবেচনা করা হয়। সাধারণভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসার ফল ভালো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, প্রোস্টেট বা আশপাশের অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ক্যানসারে আক্রান্তদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
তবে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনায় স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন নির্ধারণ করা উচিত। প্রস্রাবের সমস্যা বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারে।
সূত্র: মেডিকেল নিউজ টুডে