বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়াতে শুধু কারখানা নির্মাণ বা অর্থ ব্যয় করলেই হয় না, প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, পরীক্ষাগার ও মান যাচাইয়ের সক্ষমতা। এসব সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্যেই হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছিল সরকার।
৭ বছরের বেশি সময় ধরে চলা সেই প্রকল্পে দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্রের ভবন নির্মিত হয়েছে, কিন্তু কেনা হয়নি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। ফলে কেন্দ্র দুটি চালুও করা যায়নি। এর মধ্যে তিন দফায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৩২৩ কোটি টাকার বেশি, বাড়ানো হয়েছে মেয়াদও। এতে ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করেছে ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার। রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা কতটা অর্জিত হয়েছে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ (ইসিফোরজে) প্রকল্পে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯৪১ কোটি টাকা। তিন দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। মূল ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা প্রায় ৩৪ শতাংশ।
প্রকল্পটির আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সিইইটি ও কাশিমপুরে ডিটিসিএলএফ নামে দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেন্দ্র দুটি নির্মাণ করা হলেও যন্ত্রপাতি কেনা না হওয়ায় সেগুলোর কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। এতে যে সেবা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র দুটি নির্মাণ করা হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের অগ্রগতির হিসাবেও রয়েছে অসম্পূর্ণতার চিত্র। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৭৮২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ভৌত অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পের নির্ধারিত কাজের এক-চতুর্থাংশের বেশি বাকি রয়েছে।
এর মধ্যে অর্থায়নেও ধাক্কা এসেছে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে। পিইসি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মূল ১০ কোটি ডলারের বরাদ্দ থেকে ৩ কোটি ১৫ লাখ ডলার প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ অর্থ আর পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকল্পের আওতায় যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। ফলে কেন্দ্র দুটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহের বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন করে অতিরিক্ত ব্যয় না বাড়ানোর কথা বলা হলেও কেন্দ্র দুটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা এবং বাকি কাজ শেষ করার অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট নয়।
পরিকল্পনা কমিশন মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা, অর্থসংস্থান এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা আছে কি না, তা জানতে চেয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্র দুটি চালুর পর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং প্রকল্প শেষে সেগুলোর দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) প্রকল্পের লক্ষ্যের বিষয়ে বলা হয়েছে, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লাস্টিক সেক্টরের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি বাজারে প্রবেশের জন্য বিদ্যমান শর্তাবলি প্রতিপালনে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও চারটি টেকনোলজি সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির পরিচালক (পিডি) পদশূন্য। উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। এ বিষয়ে জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ: ইসিফোরজে প্রকল্পের দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র এখনো চালু করা সম্ভব না হলেও একই ধরনের অবকাঠামো ও সুবিধা সম্প্রসারণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নতুন প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ‘ডিপেনিং এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন’ (ডিইডিটিএফইজি) নামের প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রকল্পে আরও দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি ইসিফোরজে প্রকল্পে তৈরি কেন্দ্র দুটির জন্য যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আগের প্রকল্পে ভবন নির্মাণের পরও কেন্দ্র দুটি চালু করা যায়নি; সেগুলো কার্যকর করতে এখন নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে নতুন প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই এখনো চলছে। ফলে এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন চূড়ান্ত হয়নি। পরিকল্পনা কমিশন নতুন প্রকল্পে প্রতিটি কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়, অর্থায়নের নিশ্চয়তা এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
অন্যদিকে, ইসিফোরজে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে ব্যয় সমন্বয়ের জন্য মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত সংস্থান ও জমি ইজারা খাতের অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিদ্যমান নির্দেশনা অনুসারে জমি অধিগ্রহণ ও কন্টিনজেন্সি খাতের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। ফলে বাকি কাজের অর্থসংস্থানের জন্য বিধিবিধান মেনে বিকল্প ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে।
