তখন মাত্র ২ বছর বয়স মালতির। মা মরা মেয়ের যে কী যন্ত্রণা, তা একেবারে ছোটবেলা থেকেই বুঝেছে সে। তাই দু’বেলা থালা ভর্তি ভাত আর সমাজ বদলানোর স্বপ্নে ঘর ছেড়েছিলেন কিশোরী মালতি। যোগ দিয়েছিলেন জঙ্গলযোদ্ধা মাওবাদীদের দলে। বছরের পর বছর সেখানেই লড়াই চালিয়েছেন সমাজের বিরুদ্ধ স্রোতে। বাঁদনা-সহরায়ের আগে সেই মা মরা মেয়ে ও জামাইয়ের অপেক্ষায় ঘর সাজাচ্ছেন সৎ মা। কলকাতায় আগ্নেয়াস্ত্র রেখে আত্মসমর্পণ করেছেন মালতি মুর্মু ও তাঁর স্বামী তথা নিহত কিষানজির দেহরক্ষী মঙ্গল মাহাতো। আর এই দুই ক্যাডারের আত্মসমর্পণে আক্ষরিক অর্থেই বঙ্গ ব্রিগেডের সশস্ত্র স্কোয়াড শেষ হয়ে গেল।
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার রঞ্ঝা গ্রামের বাসিন্দা পতিত মাহাতো ওরফে পাপ্পু ওরফে মঙ্গল ওরফে পাণ্ডে ওরফে সমীর। ২০০৮ সাল থেকে মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১০ সালে ১৫ বছর বয়সে জয়পুর হাই স্কুলে পরীক্ষা দিতে বেরিয়ে সে জঙ্গলমুখী হয়ে আর বাড়ির দিকে ফিরে তাকায়নি। ধাপে ধাপে সংগঠনে আস্থা থেকে সামরিক দক্ষতা অর্জন করে কিষানজির মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর বিশ্বাসভাজন হয়ে দেহরক্ষীর দায়িত্ব সামলেছিলেন মঙ্গল। পরে বাংলার রাজ্য সম্পাদক তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আকাশের দায়িত্বভারও ছিল তাঁর।
ওই সময়েই ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ি থানার পাথরনাসা গ্রামের মলিনা ওরফে মালতি ওরফে মালা মুর্মুর সঙ্গে মঙ্গলের আলাপ। ২ বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল মালার মায়ের। তারপর মা হারা মেয়ে মাওবাদীদের দলে চলে যায়। মনমরা হয়ে পড়েছিলেন বাবা সলাই মুর্মু। পরে ২০১০ সালে তিনি জনবতি মুর্মুকে বিয়ে করেন। তিনি মালা ওরফে মালতির বিমাতা। শুক্রবার ফোনে জনবতী জানান, ‘‘বিয়ের পর মেয়ের কথা শুনেছিলাম, দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। এত বছর পর সেই ইচ্ছে পূরণ হতে চলেছে। খুব ভালো লাগছে। মেয়ে-জামাই সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসায় খুব খুশি আমরা। সামনে সহরাই পরব। তাই বাড়ি সাজিয়ে রাখব মেয়ে-জামাইয়ের জন্য।”
২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর বুড়িশোলের জঙ্গলে কিষানজির মৃত্যুর পর বাংলার জঙ্গলমহল থেকে পালিয়ে ঝাড়খণ্ডে আত্মগোপন করেন তাঁরা। পূর্ব সিংভূম থেকে দলমা, খুঁটি থেকে সরাইকেল্লা-খরসোওয়া হয়ে সিপিআই (মাওবাদী)-র পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর সারান্ডার জঙ্গলে ঘাঁটি গাড়ে। তবে ‘অপারেশন কাগার’-এর সময়ে চাপে পড়ে শেষমেষ বঙ্গ ব্রিগেডের আকাশ-সহ ১০ জন ঝাড়খণ্ড সন্নিহিত বাংলার অভিমুখে রওনা দেন। কিন্তু এক এক করে গ্রেপ্তার, আত্মসমর্পণে সশস্ত্র সংগঠন ভেঙে যায়। আকাশও ধরা পড়ে যায় কলকাতা পুলিশের এসটিএফের হাতে। শচীন, মিতা, জবা বাঁকুড়ায় আত্মসমর্পণ করেন। জঙ্গল থেকে পালিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার সরবেড়িয়া গ্রাম থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের এসটিএফের হাতে ধরা দেন ওই দম্পতি।
ওই দু’জনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ২৩ সেপ্টেম্বর ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার এমজিএম থানার কুদলুং এলাকা থেকে মালতির ব্যবহৃত একটি ইনসাস রাইফেল, ৩ টি ম্যাগাজিন ও ৪৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়। ওই দিনই মঙ্গল-মালতিকে সঙ্গে নিয়ে চাকুলিয়া থানার জোভি গ্রামের অদূরে পাহাড়ি জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা মঙ্গলের ব্যবহৃত একটি একে ৪৭ রাইফেল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১৪৭ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করে এসটিএফ। ধৃত আকাশের সঙ্গে কখনও মুখোমুখি, কখনও আলাদাভাবে জেরা করে সমস্ত তথ্য পাওয়ার পর শুক্রবার আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ দেখানো হয়। এখন পরিবারের অপেক্ষা, সমাজের মূল স্রোতে ফিরে কবে তাঁদের ঘর আলো করে আসবে মেয়ে-জামাই।
