রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে ম্যাক্স ভেবারের একটি সংজ্ঞা প্রায় অমোঘ বাক্যের মতো উচ্চারিত হয়—রাষ্ট্র হলো এমন এক মানবগোষ্ঠী, যে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ভেতর বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার সফলভাবে দাবি করে। টমাস হবস ও জন লকের সামাজিক চুক্তির তত্ত্বেও নাগরিক আত্মরক্ষার তরবারি রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় এই বিশ্বাসে যে, তা আইনের শৃঙ্খলে বাঁধা থাকবে। ভেবারের আরেকটি পর্যবেক্ষণ আরো প্রাসঙ্গিক। ‘রাজনীতি একটি পেশা’ প্রবন্ধে তিনি রাজনীতিকের নৈতিকতাকে দুই ভাগে দেখিয়েছিলেন—বিশ্বাসের নৈতিকতা ও দায়িত্বের নৈতিকতা । প্রথমটি জানতে চায় উদ্দেশ্য কতটা মহৎ; দ্বিতীয়টি জানতে চায় কাজের পরিণতি কী এবং তার দায় কার। এই তাত্ত্বিক আয়নায় তাকালেই বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ কেন শুধু মন্ত্রিসভার একটি রদবদলের খবর নয়, বরং এক গভীর অস্বস্তির উৎস।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় রেললাইনসংলগ্ন এক মাদকের আস্তানায় অভিযানে নামেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী। তার নিজের ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে আছেন, পাশ থেকে কেউ বলছেন ‘গুলি করে দেব’, আর তার এক দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি মারছেন। ইশরাকের ভাষ্য, অস্ত্রটি বৈধ; হামলার আশঙ্কায় অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে তা হাতে নিয়েছিলেন, কাউকে ভয় দেখানো উদ্দেশ্য ছিল না। রোববার রাতে একাধিক গণমাধ্যমে খবর আসে, প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন; ইশরাক ও তার দপ্তর তা অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেন। সোমবার তিনি নিজেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘আমার কারণে যেন সরকারের কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, অভিযানে তিনি ভুল করেননি এবং মাদকবিরোধী লড়াই চলবে।
বিজ্ঞাপন
অস্বস্তির প্রথম কারণ পদত্যাগের এই আখ্যানটিই। ওয়েস্টমিনস্টার ঐতিহ্যে মন্ত্রীর পদত্যাগ এক ধরনের জবাবদিহির অনুষ্ঠান, যেখানে মন্ত্রী দায় স্বীকার করেন এবং সরকার জানায় কেন সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো। এখানে পাওয়া গেছে সূত্রনির্ভর খবর, তার প্রতিবাদ, তারপর স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা। এ লেখা প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আমার চোখে পড়েনি। ফলে বিষয়টি অস্পষ্ট, পদত্যাগটি দায়ের স্বীকৃতি, নাকি সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার সতর্ক সিদ্ধান্ত।
ঘটনার ওজন বুঝতে হলে মাদকের ভয়াবহতার একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ জরুরি। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের ‘বিশ্ব মাদক প্রতিবেদন ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে ৩৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করেছে, যা এক দশক আগের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে মাদকসংশ্লিষ্ট মৃত্যু ছিল প্রায় পাঁচ লাখ, দশ বছরে বৃদ্ধি ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ—অর্থাৎ জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ; ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ। মাদক এখন আর প্রান্তিক সমস্যা নয়, তরুণ প্রজন্মের গভীর ক্ষত।
দ্বিতীয় অস্বস্তি পদ্ধতি নিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। উদ্দেশ্য যে মন্দ ছিল না, ঘটনাপ্রবাহই তার সাক্ষ্য দেয়। তার সংবাদ সম্মেলনের পরপরই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ওই একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৪ জনকে আটক করেছে। অর্থাৎ আস্তানাটি কল্পনা ছিল না, বাস্তব ছিল। সরকারি ও দলীয় সূত্রেও মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়নি; আপত্তি অভিযানের ধরনে। প্রশ্ন তাই প্রশাসনের দিকেই ঘুরে যায়। ইশরাকের ভাষ্য, স্থানীয় বাসিন্দারা দয়াগঞ্জ-ঘুণ্টিঘর এলাকার মাদকের কথা বারবার জানিয়েছেন; থানা-পুলিশ থেকে ডিসি পর্যন্ত তিনি জানিয়েছেন, পুলিশের সঙ্গে অন্তত ৩০-৪০ বার বৈঠকও করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই জনবল ও যানবাহনের সংকটের মতো ভিন্ন ভিন্ন কারণ শুনেছেন। তার দাবি, ‘আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই’; অভিযান ছিল ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলারই অংশ। অন্যদিকে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ও গেন্ডারিয়া থানার ওসি বলছেন, অভিযানের আগে তাদের জানানো হয়নি। দুটি বক্তব্যের কোনটি সঠিক, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন দুই ক্ষেত্রেই থেকে যায়—যদি তাদের জানানো না-ও হয়ে থাকে, তবে যে এলাকায় এমন মাদকের ভয়াবহ আস্তানা রয়েছে, যেখানে অভিযানে প্রাণহানির আশঙ্কা আছে, সেই খবর পুলিশের কাছে ছিল না কেন? রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের একটি আস্তানা যদি স্থানীয় থানার নজরের আড়ালে থাকে, তবে সেটি গোয়েন্দা ও নজরদারি-ব্যবস্থারই ঘাটতি।
তবে প্রশ্নটি শুধু জনবলের নয়, নিষ্ঠারও। মাদক দমনের দায়িত্বে থাকা কাঠামোর ভেতর থেকে ওঠা অভিযোগ উপেক্ষা করা যায় না। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুরে আদালতের আলামত নিষ্পত্তি শাখায় কর্মরত—অর্থাৎ জব্দ মাদকের দায়িত্বে থাকা, এক পুলিশ কনস্টেবল ১ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন; আদালত তিন দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আর তিনি বলছেন ইয়াবা তার কাছে পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের জুনে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা লুটের অভিযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তিন কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হন; অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলার কথা জানিয়েছিলেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উত্তর হাজীপাড়া এলাকায় একজন এসআইর বাসা থেকে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা এবং নগদ ৩৬ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এসবই অভিযোগ বা প্রাথমিক তদন্তের স্তরে, আদালতে এখনো প্রমাণিত নয়; কয়েকজনের কারণে পুরো বাহিনীকে দায়ী করাও অবিচার। কিন্তু যারা মাদক ঠেকাবেন, তাদের ওপর নজরদারিও সমান জরুরি আর একজন জনপ্রতিনিধির হতাশার পটভূমি বুঝতে এই প্রেক্ষাপট মনে রাখা দরকার।
তৃতীয় অস্বস্তি আরো তাত্ত্বিক। শার্ল-লুই মন্টেস্কু ক্ষমতার পৃথককরণের কথা বলেছিলেন এই যুক্তিতে যে, যে হাতে নীতিনির্ধারিত হয়, সে হাতেই বলপ্রয়োগের ভার থাকলে স্বেচ্ছাচারের পথ খোলে। একজন মন্ত্রী নীতি ঠিক করবেন, প্রশাসনকে জবাবদিহির কাঠামোয় বাঁধবেন; মাঠে নেমে নিজেই অভিযান পরিচালনা করলে ভূমিকার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। পুলিশ বাড়াবাড়ি করলে নাগরিকের সামনে অভিযোগের জায়গা আছে, আদালত আছে, বিভাগীয় তদন্ত আছে; কিন্তু অভিযানের নেতৃত্বে স্বয়ং প্রতিমন্ত্রী থাকলে সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালায় আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র বহনের অনুমতির পাশাপাশি অন্যের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধ। আইনের ব্যত্যয় হয়েছে কি না—তা পুলিশের তদন্তাধীন; তাড়াহুড়ো করে রায় দেওয়া এই নিবন্ধকারের কাজ নয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঘটনাটিকে ‘ত্রাসের রাজত্বের বহিঃপ্রকাশ’ বলেছে। ভাষার তীব্রতা রাজনৈতিক, কিন্তু আড়ালের সাংবিধানিক প্রশ্নটি অস্বীকার করা যায় না।
চতুর্থ অস্বস্তি দল ও সরকারের সীমারেখা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগেই দল ও সরকারকে রেললাইনের দুই পাতের উপমায় পাশাপাশি পৃথক রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আজ মাদকের আস্তানা চিহ্নিত করার দায় নিতে হচ্ছে একজন জনপ্রতিনিধিকে, যে কাজ মূলত রাষ্ট্রের নিয়মিত প্রশাসনের। ব্যক্তির পদত্যাগ দৃশ্যমান, কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতার জবাবদিহি অদৃশ্য।
এই অস্বস্তি কাটাতে কয়েকটি পদক্ষেপ ভাবা দরকার। প্রথমত, পদত্যাগের কারণ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারের সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আসা উচিত। দ্বিতীয়ত, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং একই সঙ্গে ইশরাকের অভিযোগ—থানা, পুলিশ ও ডিসিকে জানিয়েও সাড়া মেলেনি—নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা। তদন্তে যে পক্ষেরই ব্যত্যয় ধরা পড়ুক, পদের মর্যাদা নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিতে হবে; তৃতীয়ত, জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকার একটি আচরণবিধি দরকার—সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা সংসদীয় কমিটি, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটি ও প্রশ্নোত্তর পর্বের মতো বৈধ মাধ্যমে প্রশাসনকে চাপ দেবেন; মাঠে নেমে বলপ্রয়োগের দায়িত্ব নেবেন না। চতুর্থত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে গেন্ডারিয়ার মতো চিহ্নিত মাদকপ্রবণ এলাকার জন্য গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, নির্দিষ্ট সময়ের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে আর মাদক দমন-সংশ্লিষ্ট বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিও জোরদার করতে হবে। যে অভিযান পদত্যাগের পর হয়েছে, তা যদি আগে নিয়মিত হতো, তবে হয়তো এই টানাপোড়েনের প্রয়োজনই পড়ত না।
রোমান কবি জুভেনালের একটি প্রশ্ন রাজনৈতিক তত্ত্বের ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে—প্রহরীকে প্রহরা দেবে কে? ইশরাকের পদত্যাগের কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসাও আসলে এটিই। রাষ্ট্র যদি তার প্রহরীদের নিয়মের আওতায় আনতে না পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ আস্তানার খবর রাখতে না পারে, তবে হয় নাগরিক নিজের হাতে তরবারি তুলে নেবে, নয়তো ক্ষমতাধর নিজেই আইনের জায়গা দখল করে নেবে। ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ ব্যক্তির অধ্যায়ে একটি যতিচিহ্ন বসিয়েছে মাত্র; প্রশ্নটির উত্তর এখনো অসমাপ্ত। উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে, কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য কখনো আইনের বিকল্প নয়—ভেবারের দায়িত্বের নৈতিকতা আমাদের এই সরল সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। এই অস্বস্তি ততদিন থাকবে, যতদিন না পদত্যাগের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সংস্কারই আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
লেখক : অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
