বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়েই দেশটির দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াকে ডেকে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি কূটনৈতিক পত্র দেয়া হয়েছে।
১৯ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘আমরা রায়ের কপি হাতে পেলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে জানাতে ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারবো।''
বন্দিতালিকায় দুইজনের নাম থাকলেও দণ্ড পাওয়ার তথ্য কেন জানানো হলো না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, "নথিপত্র পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।”
তিনি বলেন, "সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সৌদি আরবের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে। এখন উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।”
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর ডয়চে ভেলেকে বলেন, "আমাদের মন্ত্রণালয়ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতবাসের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত যা জেনেছি তা সংবাদ মাধ্যমের তথ্য।
১৪ অক্টোবর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গণমাধ্যম মক্কায় মসজিদ এলাকায় 'অনৈতিক কাজের দায়ে' দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার তথ্য প্রচার করে।
পরিবারে শোকের মাতম
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ২৫ বছর বয়সি তরুণের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলায়। দণ্ড কার্যকরের আগে তার পরিবারও এ বিষয়ে তথ্য জানতো না৷ তার বাবা বলেছেন, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরব থেকে একজন ফোনে দণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা তাদের জানায়।
এই তরুণ ২০২২ সালে সৌদি আরব যান চাকরি নিয়ে। সেখানে যাওয়ার আট মাস পর ২০২৩ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পরিবারের সদস্যরা জানতেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি ১১ অক্টোবর সবশেষ টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন৷
তরুণের বাবা কান্না জড়িত কন্ঠে ডয়চে ভেলেকে বলেন, "এক বছর পর তাকে অন্য কারাগারে নেয়। আমরা ভেবেছিলাম সে মুক্তি পাবে। কিন্তু ওই দেশের ব্যবস্থায় তার মৃত্যুদণ্ড হলো। আমার ছেলেকে হারালাম। এখন একটা ব্যবস্থা করা হোক। তার ফাঁসির খবর পেয়ে তার ফুপুও স্ট্রোক করে মারা গেছে। ছেলেও হারালাম, বোনও হারালাম।”
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "প্রত্যেক দেশের নাগরিক, আরো যারা সেখানকার কারাগারে আছে সেই দেশের লোকজন গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিয়েছে। কিন্তু আমার ছেলের কেউ খোঁজ-খবর নেয় নাই।”
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তরুণীর বাড়ি টাঙ্গাইলে।
দূতাবাসের ভূমিকা ও শ্রমবাজার নিয়ে প্রশ্ন
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, "ওই দুইজনের বাপারে পুরো তথ্য তো সরকারও জানে না। জানার চেষ্টা করছে। কিন্তু অন্য দেশের নাগরিক হলে এমন হতো না। তারা জানত। আমাদের দুই নাগরিকের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা দুঃখজনক। সৌদি সরকার কী তথ্য জানায় সেটার পর আমাদের এখানে একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি হওয়া দরকার। সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাইরে রেখে। দেখা দরকার কী হয়েছে, কার কী দায় দায়িত্ব আছে। বিদেশে আমাদের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষায় আদৌ কিছু করা হয়েছে কী না। করার সুযোগ ছিলো কী না। তা দেখা দরকার।”
সৌদি আরবে বিশাল শ্রমবাজারের বিষয় বিবেচনা রেখে বাংলাদেশকে অনেক নমনীয় অবস্থান নিতে হয় বলেও মনে করেন আসিফ মুনীর৷
তিনি বলেন, "আসলে আমাদের যেটা হয় তা হলো আমরা প্রশ্ন তুলতে ভয় পাই। আমাদের অনেক কর্মী ওখানে আছে। ফলে আমরা প্রশ্ন তুললে যদি তারা কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেয়? সেই কারণে আমরা অনেক প্রশ্ন তুলি না, অনেক কথা বলি না, জানতে চাই না৷”
সৌদি আরবে নির্যাতনের সম্মুখীন এক বাংলাদেশি নারীর কথা
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, "আসলে বিষয় যেটা হচ্ছে, তা হলো নির্ভরশীলতার। আমাদের অর্থনীতিতে ধস নামবে যদি সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানিতে ভাটা পড়ে। এখানে অর্থ বড় কথা। সেই কারণে আমরা কিছু বলছি না বা বলতে পারি না৷”
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন কী বলে? দূতাবাসের ভূমিকাই বা কী হওয়া উচিত?
এম হুমায়ূন কবির বলেন, "ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার অ্যাকসেসে বলা আছে, যদি কোনো দেশে অন্য দেশের নাগরিক আটক হয় তাহলে যে দেশে আটক হয়েছে সেই দেশের কাছে কনস্যুলার সুবিধার জন্য অনুরোধ করতে পারে। আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে। এখন সেই সুবিধা বাংলাদেশি দুই নাগরিকও পেতে পারতেন। কিন্তু তথ্য ছিলো কী না, সেটাই প্রশ্ন। কারণ এখন পর্যন্ত আমরা যা জানি তাতে আমাদের সরকারের কাছে কোনো তথ্য ছিলো না। সরকার সেটাই বলছে।
তিনি বলেন, "আমাদের ৩০ লাখ লোক সৌদি আরবে আছে। দূতাবাসে কি যথেষ্ট লোক আছে খোঁজ নেয়ার? আর যারা আছে তারাও কি খোঁজ রাখতে চায়?”
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান মনে করেন, এই মৃত্যুদণ্ড এড়ানো যেত। তিনি বলেন, "সৌদি আরব করেনি, কারণ এটা বাংলাদেশ। তারা প্রয়োজন মনে করেনি। অন্য দেশ হলে পারত না।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর দুই বাংলাদেশি সৌদি আরবে নাগরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে ডয়চে ভেলেকে বলেন, "এই ধরনের ইস্যুতে বাংলাদেশের হয়ে সাধারণত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করে। তারপরও আমরা খবর পাওয়ার পর আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে আমাদের মিশনের মাধ্যমে জানতে চেয়েছি কী কারণে এবং কেন এই ঘটনা ঘটেছে।”
সৌদি আরবে নারীশ্রমিক নির্যাতনের প্রতিকার নেই
২০১৮ সালের শুরুর দিকে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে যান কোহিনূর আক্তার। পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে তার ছদ্মনাম ব্যবহার করছে ডয়চে ভেলে৷
নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪ মাসের মাথায় দেশে ফিরে আসেন কোহিনূর। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, "শুরুতে আল খারেজে ছিলাম, সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে রিয়াদে চলে আসি। রিয়াদেও এক বাসায় নির্যাতনের শিকার হয়ে আরেক বাসায় আসি। সেখানেও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হই। খাবার দাবারও ঠিক মতো দিতো না। সেখান থেকে একটি অফিসে চাকরি নিই। সেখানেও একই অবস্থা। সেখান থেকে বাঁচার জন্য আমি তিন তলা থেকে ঝাঁপ দিই। পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার ডান পা ও মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। দুই মাস চিকিৎসার পর দূতাবাস আমাকে সেফ হোমে নিয়ে যায়। এরপর আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়।”
দেশে ফেরার পর এই নারীর সংসারও ভেঙে গেছে। একমাত্র সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি। পঙ্গুত্ব নিয়ে তার এখন এক দুর্বিষহ জীবন।
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, "এরকম আরো শত শত নারী সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেকে লাশ হয়ে ফিরেছেন। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে কখনো কথা বলিনি। আমরা তদন্ত করে দেখিনি কেন তাদের এই পরিণতি।”
"যেখানে শ্রীলঙ্কা-নেপালের মতো দেশ এই কারণে তাদের নারী কর্মীদের সৌদি আরবে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে, সেখানে আমরা প্রতিবাদটুকুও করছি না। আমরা যেন ফকির মিসকিন,” বলেন তিনি।
তার অভিযোগ, "শতাধিক নারী সৌদি আরবে আত্মহত্যা করেছে। শতাধিক নারীর গায়ে গরম পানি দিয়ে পেড়ানো হয়েছে। আয়রন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। ছাদ থেকে ফেলে দেয়া। যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। সব ধরনের নির্যাতনই হচ্ছে সৌদি আরবে। কিন্ত আমরা এর প্রতিকার করতে পারছি না। প্রতিবাদ করছি না। এক দশকে ১০ হাজার নারী এই ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছে। আমাদের দূতাবাস কি সৌদি পুলিশের কাছে কখনো অভিযোগ করেছে?”
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। আর নারীদের অধিকাংশই যায় সৌদি আরবে। ফিরে আসা নারীদের একটি অংশ নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এই সময়ে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে এসেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর বলেন, "আমাদের কর্মীরা কোনো দেশে যদি কোনো সমস্যায় পড়ে বা নির্যাতনের শিকার হন, তার জন্য দূতাবাসগুলোতে আইনি সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা আছে। ১০টি দেশে আমাদের লিগ্যাল অফিস আছে। সৌদি আরবেও আছে। সেখান থেকে আইনগত সহায়তা, ক্ষতিপুরণ আদায়ে সহায়তা করা হয়। সৌদি আরবসহ তিনটি দেশে নারীদের জন্য আমাদের সেইফ হোমও আছে। তারা কোনো সমস্যায় পড়লে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।”
মামলা বা ক্ষতিপুরণের ব্যাপারে জানতে চাইলে সৌদি আরবে নির্যাতিতা নারী কোহিনূর আক্তার বলেন, "আমি মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দূতাবাসের লোকজন করতে দেয়নি। বলেছে, তোমাকে তিন তলা থেকে কে লাফ দিতে বলেছে? আর মামলা করলে উল্টো আমার বিরুদ্ধে মামলা হতো। কোনো ক্ষতিপুরণ পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো পাঁচ মাসের বেতন না নিয়ে চলে আসতে হয়েছে। আমাকে লেবার কোর্টে গিয়ে বলতে হয়েছে, আমার মালিকের কাছে কোনো বেতন পাওনা নেই। পাওনা চাইলে আমাকে আবার পাঁচ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হতো।”
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দাবি, "আগের চেয়ে সৌদি আরবে নারীদের নির্যাতনের সংখ্যা কমেছে৷”
