একজন সাধারণ স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক, যার বেতনের সরকারি স্কেল সম্পর্কে কারোরই অজানা থাকার কথা নয়। অথচ এই সীমিত আয়ের আড়ালেই গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার অদৃশ্য এক সাম্রাজ্য। রাজধানীর কদমতলীর পিএনপি শহীদ ফারুক মোহাম্মদ ইকবাল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহজালাল হোসেন লিটনের বিপুল বিত্তবৈভবের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তার সম্পদের যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তা সাধারণ কোনো শিক্ষকের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং কোনো শতকোটি টাকার ধনকুবেরের সম্পত্তির তালিকাকেও হার মানায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষকতার আড়ালেই শাহজালাল হোসেন লিটনের হাতে যেন চলে এসেছে রূপকথার এক আলাদিনের প্রদীপ। কদমতলী ও তার আশপাশের এলাকাতেই তিনি গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের পাহাড়। কেবল ইসলামবাগ এলাকাতেই ১১ তলা ভবনে রয়েছে তার ৪টি ফ্ল্যাট। এছাড়া শাপলা টাওয়ারে ২টি, ৪ নম্বর রোডে রাজউক প্রজেক্টে ২টি, পূর্ব ডিএমএস টাওয়ারে ২টি এবং ৬ নম্বর রোডের পলাশপুর টাওয়ারে আরও ২টি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার কয়েকটি ইতোমধ্যে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রিও করা হয়েছে। শুধু ফ্ল্যাটেই ক্ষান্ত হননি এই শিক্ষক, রাজধানীর জাপানি বাজারে ৪ কাঠা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের এক আলিশান ৩ তলা বাড়ি।
রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে আছে তার ভূ-সম্পত্তির এক সুবিশাল রাজত্ব। নিজ জেলা মানিকগঞ্জে প্রায় ৫০ বিঘা জমির ওপর তৈরি করেছেন এক রাজকীয় বাগানবাড়ি। এর পাশাপাশি এলাকায় তার নামে রয়েছে আরও অন্তত ৬০ বিঘা ব্যক্তিগত জমি। সব মিলিয়ে কেবল মানিকগঞ্জেই ১১০ বিঘা জমির মালিক এই শিক্ষক। এর বাইরে শিক্ষকতার পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ব্যবসা ও শেয়ার বাজারেও ছড়িয়েছেন নিজের হাত। পলাশপুর আইডিয়াল স্কুলের শেয়ারের পাশাপাশি ‘সুখের ঠিকানা’ নামক একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানে তার সরাসরি ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ রয়েছে।
বর্তমানে কদমতলীর দক্ষিণ নূরপুর ও মুরাদপুর এলাকায় বসবাসকারী একজন সাধারণ সহকারী শিক্ষক কীভাবে এবং কোন জাদুবলে এমন কুবেরের ধন অর্জন করলেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভ। এ বিষয়ে তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে চাঞ্চল্যকরভাবে জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অবৈধ সম্পদের অভিযোগগুলো ‘আংশিক সত্য’।
তবে ঘটনার পর পরই পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়। বক্তব্যের কিছুক্ষণ পরেই এই প্রতিবেদকের কাছে ফোন আসে লিটনের ভাই পরিচয়দানকারী শাহীপুর রহমান মনির নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে। নিজেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য দাবি করে কথিত সাংবাদিক মনির খবরটি প্রকাশ না করার জন্য চরম হুমকি প্রদান করেন এবং প্রতিবেদককে জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রতিবেদক জাতীয় প্রেস ক্লাবে গেলে সেখানে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং পরবর্তীতে বারবার তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পবিত্র শিক্ষা পেশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই শিক্ষক কীভাবে বিশাল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়লেন, তার মূল উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
