মহাজাগতিক আতশবাজির সবচেয়ে বড় রূপ সুপারনোভা। আপনি যদি মহাকাশ নিয়ে সামান্য খোঁজখবরও রাখেন, তবে নিশ্চয়ই এই নামটির সঙ্গে পরিচিত। বিশাল আকৃতির তারারা যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন ঘটে এই প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ। মাসের পর মাস এই আলো মহাকাশে টিকে থাকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এটি গবেষণার অন্যতম প্রিয় একটি বিষয়। সুপারনোভার বেশ কয়েকটি ধরন আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘কোর-কোল্যাপস সুপারনোভা’। মহাকাশে যত সুপারনোভা ঘটে, তার প্রায় ৭০ শতাংশই এই ধরনের।
তবে বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই কোর-কোল্যাপস সুপারনোভার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও উজ্জ্বল একধরনের বিস্ফোরণ আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম হাইপারনোভা। আমাদের সূর্যের চেয়ে অন্তত ৩০ গুণ বা তার বেশি ভরের তারার ক্ষেত্রেই কেবল এমনটা ঘটা সম্ভব। সাধারণ সুপারনোভার চেয়ে এটি প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হয়। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড গতিশক্তিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তারার ভেতরের উপাদান। কিন্তু সমস্যা হলো, এই হাইপারনোভা আসলেই ঘটে কি না, তার সপক্ষে শক্ত প্রমাণ বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা বলছে, এই হাইপারনোভা হয়তো পুরোটাই ফাঁকা আওয়াজ। বাস্তবে হয়তো এর কোনো অস্তিত্বই নেই!
সুপারনোভার বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। কোনো বেশি ভরের নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি তার নিজস্ব মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নিজের কেন্দ্রেই ধসে পড়ে। এরপর এক বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে সেই নক্ষত্রের বিভিন্ন স্তর। এটাই কোর-কোল্যাপস সুপারনোভা।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই কোর-কোল্যাপস সুপারনোভার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও উজ্জ্বল একধরনের বিস্ফোরণ আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম হাইপারনোভা।
সুপারনোভা যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন মহাজাগতিক ধাতু মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যাস আর ধাতু মিলেই পরে নতুন প্রজন্মের নক্ষত্রের জন্ম হয়। মিল্কিওয়ের একেবারে বাইরের দিকে (যাকে হ্যালো বলা হয়) এবং আমাদের কাছের স্কাল্পটর ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সিতে এমন কিছু নক্ষত্র আছে, যাদের রাসায়নিক গঠন একটু অদ্ভুত। এগুলোতে ধাতুর পরিমাণ একদমই কম। এখানে জানিয়ে রাখি, জ্যোতির্বিজ্ঞানে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম বাদে বাকি সব মৌলকেই ধাতু হিসেবে ধরা হয়। মহাবিশ্বের শুরুর দিকের নক্ষত্রে ধাতুর পরিমাণ খুব কম থাকে, যা পরে সুপারনোভার মাধ্যমে বাড়ে।

বিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন, এই বিশেষ তারাগুলোর জন্ম হয়েছে একটি মাত্র বিশাল নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে। তাঁদের ধারণা ছিল, বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের ভেতরের গ্যাস মহাশূন্যে একদম সুষমভাবে মিশে যায়। বিজ্ঞানীরা সাধারণ সুপারনোভার গাণিতিক মডেলের সঙ্গে এই তারাগুলোর রাসায়নিক গঠনের তুলনা করে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না। যখন সাধারণ সুপারনোভার মডেলে কাজ হলো না, তখন তাঁরা হাইপারনোভার তত্ত্ব দাঁড় করান। এই মডেলটি মহাবিশ্বের শুরুর দিকের নক্ষত্রের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে গিয়েছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম বাদে বাকি সব মৌলকেই ধাতু হিসেবে ধরা হয়। মহাবিশ্বের শুরুর দিকের নক্ষত্রে ধাতুর পরিমাণ খুব কম থাকে, যা পরে সুপারনোভার মাধ্যমে বাড়ে।
হাইপারনোভার এই মডেলটি টিকে ছিল একটি মাত্র ধারণার ওপর ভিত্তি করে—বিস্ফোরণের পর সব উপাদান সমানভাবে মিশে যায়। কিন্তু যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত নতুন দুটি গবেষণা বলছে অন্য কথা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মুলার্ড স্পেস সায়েন্স ল্যাবরেটরির পিএইচডি গবেষক আনমোল আগরওয়াল এবং রালফ শোনরিখ এই গবেষণাপত্র দুটি লিখেছেন। তাঁদের মতে, বিস্ফোরণের পর উপাদানগুলো মোটেও সমানভাবে মেশে না। আর তাই ওই প্রথম দিকের কম ধাতুওয়ালা নক্ষত্রগুলোর জন্মের পেছনে হাইপারনোভার কোনো হাত নেই। যেহেতু ওই নক্ষত্রগুলোই ছিল হাইপারনোভা থাকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, তাই হাইপারনোভা বলতে আদৌ কিছু আছে কি না, তা নিয়েই এখন বিরাট প্রশ্ন উঠে গেছে।
আগরওয়াল বিষয়টা খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, সুপারনোভার পর তারার সব উপাদান ব্লেন্ডারে মেশানো জুসের মতো একাকার হয়ে যায় না। হয়তো অক্সিজেন একদিকে উড়ে গেল, তো সালফার ছুটে গেল অন্যদিকে। ফলে নতুন যে তারাটি জন্ম নিচ্ছে, সেটি সুপারনোভার পুরো মিশ্রণ থেকে তৈরি হচ্ছে না। বরং সুপারনোভার ছিটিয়ে দেওয়া উপাদানের কোনো একটি নির্দিষ্ট খণ্ড বা ভগ্নাংশ থেকে তার জন্ম হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে দেখেছেন, অদ্ভুত রাসায়নিক গঠনের এই নক্ষত্রগুলো সাধারণ সুপারনোভা থেকেই তৈরি হওয়া সম্ভব। যদি সমানভাবে মেশার শর্তটি বাদ দেওয়া হয়, তবে সাধারণ সুপারনোভাই এদের ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট। আগরওয়ালের ভাষায়, ‘হাইপারনোভা থাকার যত প্রমাণ আমাদের কাছে ছিল, তা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল।’
আনমোল আগরওয়ালের মতে, সুপারনোভার পর তারার সব উপাদান ব্লেন্ডারে মেশানো জুসের মতো একাকার হয়ে যায় না। হয়তো অক্সিজেন একদিকে উড়ে গেল, তো সালফার ছুটে গেল অন্যদিকে।
একটি বিশাল তারা যখন তার জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তার ভেতরে পেঁয়াজের মতো স্তরে স্তরে বিভিন্ন মৌল জমা হয়। একদম কেন্দ্রে থাকে সবচেয়ে ভারী মৌলগুলো, আর বাইরের দিকে থাকে হালকাগুলো। নতুন মডেলে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওই কম ধাতুর তারাগুলো তৈরি হতে প্রতিটি স্তরের ঠিক কতটুকু উপাদান দরকার। দেখা গেল, পুরো একটি হাইপারনোভা নয়, বরং সাধারণ সুপারনোভার নির্দিষ্ট কিছু অংশের মিশ্রণই এই তারাগুলোর জন্মের জন্য দায়ী।
প্রথম গবেষণায় তিনটি তারার কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে আগে হাইপারনোভার ফসল ভাবা হতো। আর দ্বিতীয় গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মিল্কিওয়ের হ্যালোতে থাকা একটি নির্দিষ্ট রেড জায়ান্ট নক্ষত্রের দিকে। এই তারার রাসায়নিক গঠন অত্যন্ত অদ্ভুত। সুপারনোভা অনেক ভারী মৌল তৈরি করতে পারলেও ইউরেনিয়াম বা রুপার মতো কিছু মৌল তৈরি করতে পারে না। এগুলো তৈরি হয় নিউট্রন স্টার মার্জার থেকে অথবা তীব্র চৌম্বকীয় নক্ষত্রের হাইপারনোভা থেকে। নিউট্রন স্টার মার্জার হলো দুটি অত্যন্ত ঘন নিউট্রন তারার মধ্যে প্রবল সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের ফলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভারী মৌলগুলো তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাল দৈত্য তারার জন্ম আসলে মিল্কিওয়েতে হয়নি। এটি তৈরি হয়েছিল ছোট কোনো বামন ছায়াপথে, যা পরে আকাশগঙ্গার সঙ্গে মিশে যায়।
আগের গবেষণায় বলা হয়েছিল, এই রেড জায়ান্ট নক্ষত্রটি এতই কম ধাতুর যে এটি কোনো নিউট্রন স্টার মার্জার থেকে তৈরি হতে পারে না। কারণ, যে সময় এই তারাটির জন্ম, তখন মিল্কিওয়েতে এত দ্রুত ভারী ধাতু ছড়িয়ে পড়েছিল যে নিউট্রন তারা তৈরি হয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটার মতো যথেষ্ট সময় পার হয়নি। তাই বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, এর পেছনে হাইপারনোভাই দায়ী।
কিন্তু আগরওয়াল আর শোনরিখের গবেষণা এই যুক্তি পুরোপুরি খণ্ডন করেছে। যে লাল দৈত্য তারাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি শুধু প্রচণ্ড গতিতেই ছুটছে না, এটি আমাদের ছায়াপথের অন্য সব তারার ঠিক উল্টো দিকে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তারার জন্ম আসলে মিল্কিওয়েতে হয়নি। এটি তৈরি হয়েছিল ছোট কোনো বামন ছায়াপথে, যা পরে আকাশগঙ্গার সঙ্গে মিশে যায়। ওই ছোট ছায়াপথগুলোতে তারার জন্ম অনেক ধীরগতিতে হয়। তাই সেখানে নিউট্রন স্টার মার্জার ঘটার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল।
নতুন গাণিতিক মডেল পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে, এই অদ্ভুত রেড জায়ান্ট তারার ব্যাখ্যার জন্য কোনো হাইপারনোভার প্রয়োজন নেই। একটি সাধারণ কোর-কোল্যাপস সুপারনোভা এবং একটি নিউট্রন স্টার মার্জার মিলেই এই তারাটি তৈরি করতে পারে।
যে লাল দৈত্য তারাটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি শুধু প্রচণ্ড গতিতেই ছুটছে না, এটি আমাদের ছায়াপথের অন্য সব তারার ঠিক উল্টো দিকে ঘুরছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তারার জন্ম মিল্কিওয়েতে হয়নি।
পুরো ব্যাপারটির মূল রহস্য লুকিয়ে আছে সুপারনোভার পর উপাদানগুলো মহাশূন্যে কীভাবে ছড়ায় এবং মেশে, তার ওপর। ড. শোনরিখ বলেন, ‘সুপারনোভার উপাদান নতুন তারা তৈরির আগে কতটা ভালোভাবে মেশে, তা আমরা এখনো ঠিকমতো জানি না। তবে আমাদের গবেষণা বলছে, উপাদানগুলো মেশে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি সমানভাবে মেশে না।’
গ্যালাক্সিতে কীভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের বিবর্তন ঘটে এবং মহাশূন্যের গ্যাসীয় মাধ্যম কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে এই ‘অসম্পূর্ণ মিশ্রণের’ ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে হবে। এতদিন ধরে যে হাইপারনোভা নিয়ে এত মাতামাতি ছিল, তা হয়তো সত্যিই অলীক কল্পনা!
