কালবেলা · সাধারণ
এজাহার-চার্জশিটে অসংগতি, দুদকের মামলায় খালাস পেলেন সুমি রহমান
২১/১০/২০২৬

স্বামীর ‘ক্যাসিনো’ ব্যবসার আয় থেকে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সুমি রহমানকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি শেখ তাহসীন আলীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৮ জুলাই এ রায় দেন। ২৭ পৃষ্ঠার রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ১৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের বক্তব্যে গুরুতর অসংগতি এবং তদন্ত কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যের কারণে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালত।
‘সুমি রহমান বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ শীর্ষক ফৌজদারি আপিল মামলায় দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট সুমি রহমানের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশও প্রত্যাহার করেছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর সুমি রহমান ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সংস্থাটির তৎকালীন উপপরিচালক মো. গুলসান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮-২০১৯ করবর্ষ পর্যন্ত সুমি রহমান নিজের নামে ১ কোটি ৩১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। তার স্বামীর কথিত অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা ও অন্যান্য অবৈধ আয়ের উৎস থেকে পাওয়া অর্থে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে দুদক।
তদন্তে তার মোট নিট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৩ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ টাকা পাওয়া যায় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া আয়কর নথিতে তার আয় দেখানো হয়েছিল ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
অথচ ২০১১ সালের ২৬ মে তিনি ১১ লাখ টাকায় ঢাকায় একটি জমি কেনেন। একই বছরের ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শুক্রাবাদে একটি পাঁচতলা বাড়িও কেনেন তিনি। বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও এসব সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনে দুদক।
তদন্তে বিভিন্ন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুমি রহমানের হিসাবে ১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার ৯৬৫ টাকা পাওয়া যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তার মুরগির খামারে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে পরের বছর ১ কোটি ২৫ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকা আয় দেখানো নিয়েও প্রশ্ন তোলে দুদক।
তবে হাইকোর্টে আপিলের শুনানিতে সুমি রহমানের আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘মামলার এজাহারে তার মক্কেলের বিরুদ্ধে স্বামীর ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে আয় করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগপত্রে স্বামীর কথিত ক্যাসিনো ব্যবসার বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। এজাহার ও অভিযোগপত্রের এই পার্থক্য মামলার অভিযোগের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করেছে।’
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের বক্তব্যের মধ্যে গুরুতর অসংগতি রয়েছে। একই ব্যক্তি পিডব্লিউ-১ ও পিডব্লিউ-১৩ হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আপিলকারীর আয়ের উৎস সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। এতে মামলার বিচারে গুরুতর ত্রুটি তৈরি হয়েছে।’
আদালত আরও বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা সুমি রহমানের বাবার আয়কর নথি যথাযথভাবে পরীক্ষা করলে তার আয়ের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে জানতে পারতেন।’
সুমি রহমান তার বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া সম্পদের বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বাবার আয়ের উৎস যথাযথভাবে তদন্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে পর্যবেক্ষণ করেন আদালত।
মামলায় সুমি রহমানের স্বামীও আসামি ছিলেন। তবে বিচারিক আদালত তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন। এ বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, সুমি রহমানের স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তাই একই ধারায় সুমি রহমানের ক্ষেত্রেও সমান বিবেচনা প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে মামলার তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ সুমি রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আপিলের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিচারিক আদালত সুমি রহমানকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তার নামে থাকা প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল করেন সুমি রহমান। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে ছয় মাসের জামিন দেওয়া হয়। পরে জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায়, দণ্ডাদেশ ও আদেশ বাতিল করে সুমি রহমানকে খালাস দেন। পাশাপাশি তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ প্রত্যাহার এবং নিম্ন আদালতের নথি অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
আদালতে সুমি রহমানের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আশরাফ আলী ও মো. জিয়াউল করিম খান। দুদকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. ওমর ফারুক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗