বাংলাদেশের কয়লা আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস ইন্দোনেশিয়া। দেশটির উৎপাদন অনুমোদন ও রপ্তানি নীতি পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কয়লা আমদানির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার সময় এখনই। না হলে একদিকে যেমন সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বাড়তি মূল্যের চাপ অর্থনীতিকে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার কয়লা রপ্তানি নীতিমালা পর্যালোচনা এবং দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়ার খনি পরিচালনায় বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট অনুমোদনব্যবস্থা Rencana Kerja dan Anggaran Biaya (RKAB) আরকেএবি’র মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আরকেএবি খনির উৎপাদন পরিকল্পনা ও অনুমোদিত উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। দেশটির জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রবিধান (২০২৫ সালের ১৭ নম্বর প্রবিধান) অনুযায়ী, ২০২৭ সালের আরকেএবি আবেদন জমার সময়সীমা রয়েছে ১ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। ফলে ২০২৭ সালের জন্য কোন খনি কত পরিমাণ কয়লা উৎপাদন ও বিক্রির অনুমোদন পাবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার আগে সরবরাহকারীদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের কয়লা সরবরাহ চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কিছু খনি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন অনুমোদন ও অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহের বাধ্যবাধকতার শর্ত যুক্ত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ডিজেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো কয়লার ক্ষেত্রেও যেন সরবরাহের অনিশ্চয়তা কিংবা অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের ঝুঁকি তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি মনে করা হচ্ছে।
আমাদের দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন কেন্দ্রগুলো, কেন শুধু আন্তর্জাতিক দরপত্রের ওপর নির্ভর করছে? যেখানে কয়লা রপ্তানিকারক দেশগুলোর রপ্তানিকারকদের তালিকাভুক্তির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সাশ্রয়ী দামে কয়লা সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, আরপিজিসিএল ও বিসিআইসির মতো সরকারি দপ্তরগুলো দরপত্র, জি-টু-জি এবং তালিকাভুক্তির মাধ্যমে-সব উপায়েই সরবরাহ নিশ্চিত করার পথ খোলা রেখেছে।
সম্প্রতি আরপিসিএল–আরএনপিএল এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা সরবরাহের জন্য দুই বছর মেয়াদি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার নতুন বার্ষিক খনি উৎপাদন পরিকল্পনা ও অনুমোদননীতির আওতায় খনি প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও রপ্তানির অনুমোদন প্রতিবছর নির্ধারিত হওয়ায়, দুই বছরের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দরদাতাদের ভবিষ্যৎ সরবরাহঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।ফলে দরদাতারা প্রস্তাবিত মূল্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ঝুঁকি-প্রিমিয়াম যোগ করতে পারেন, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কয়লা ক্রয়মূল্যের ওপর পড়তে পারে। আর তেমনটি হলে বিশাল ঘাটতিতে থাকা বিদ্যুৎ খাত আরও সংকটের পতিত হতে পারে।
কয়লা সরবরাহের দরপত্রের শর্তাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কয়লার মূল দর নির্ধারণে বিল অব লেডিং (বি/এল) তারিখের আগের ক্যালেন্ডার মাসের সাপ্তাহিক আর্গাস আইসিআই-৩ সূচকের গড় ব্যবহার করা হবে। সাধারণ বাণিজ্যিক বিবেচনায়, স্বল্পমেয়াদি মূল্য ওঠানামার তুলনায় মাসিক গড় বাজারদরের অনিশ্চয়তা বেশি থাকায় দরদাতারা ভবিষ্যৎ মূল্যঝুঁকি বিবেচনায় অতিরিক্ত ঝুঁকি-প্রিমিয়াম বা মূল্য-উপাদান যোগ করতে পারেন।
অথচ উক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রে গুলোর প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ছয়টি কয়লাবাহী জাহাজের চালান প্রয়োজন হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে-প্রতিটি চালানের মূল দর কি বিল অব লেডিংয়ের তারিখের অব্যবহিত আগের সর্বশেষ প্রকাশিত আইসিআই-৩ সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় কিনা। এ ধরনের পদ্ধতি বিবেচনা করা হলে দরদাতাদের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য-অনিশ্চয়তার জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যোগ করার প্রয়োজন কমতে পারে এবং তারা আরও প্রতিযোগিতামূলক দর প্রস্তাব করতে উৎসাহিত হতে পারেন।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য কয়লা সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় মূল্য-প্রিমিয়াম এড়ানো। ইন্দোনেশিয়ার বার্ষিক উৎপাদন অনুমোদন ও নতুন রপ্তানি ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ সরবরাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দরপত্রের মেয়াদ, মূল্য নির্ধারণের সূত্র, সরবরাহকারী তালিকাভুক্তি এবং বিকল্প সংগ্রহ ব্যবস্থা নিয়ে এখনই তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কয়লা সরবরাহের নিরাপত্তা চাই, অযৌক্তিক মূল্য-প্রিমিয়াম নয়।
লেখক: মোঃ আশেকুর রহমান খান, আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক ও চার্টার্ড মার্কেট টেকনিশিয়ান
