Published on
:
2 min read
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
শীতের কাঁপুনি কি এ বছর আদৌ অনুভূত হবে? নাকি উলের পোশাক আলমারিতেই রেখে দিতে হবে? প্রশান্ত মহাসাগরে যে ভাবে ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে ‘গডজ়িলা’ এল নিনিও, তাতে শীতের স্বাভাবিক ছন্দে বড়সড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজ়েশন (ডব্লিউএমও)-র পূর্বাভাস, ২০২৭-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই জলবায়ুগত পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনা। বছরের শেষে, অর্থাৎ বড়দিনের সময়ে, চূড়ান্ত শক্তিতে পৌঁছতে পারে এই প্রাকৃতিক ঘটনা। তার প্রভাবে কি ভারতের শীতও ম্লান হতে চলেছে? শীত পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে, এমন পূর্বাভাস না থাকলেও দেশের বিস্তীর্ণ অংশে শীতের দাপট ফিকে হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে দেখা দেওয়া অতি শক্তিশালী এল নিনিওকে আবহবিদদের একাংশ ‘গডজ়িলা এল নিনিও’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। এল নিনিও হলো এমন একটি জলবায়ুগত পরিস্থিতি, যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের জলের উপরিতল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে যে এল নিনিও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সম্ভাব্য তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে একে অতীতের সব এল নিনিওর চেয়ে শক্তিশালী বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা জরুরি বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় জল অনেক বেশি উষ্ণ হতে শুরু করেছিল। ওই সময়ে সমুদ্রের জল স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম হয়ে উঠেছিল। জুলাইয়ে সেই তাপমাত্রার ফারাক পৌঁছয় প্রায় ২ ডিগ্রিতে। জুলাইয়ের শেষ থেকে অগস্টের মাঝামাঝি সাপ্তাহিক পরিমাপে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২.২ থেকে ২.৬ ডিগ্রি। সমুদ্রের উপরিভাগের নীচেও কোনও কোনও এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি ছিল। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা এল নিনিওর শক্তি আরও বাড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এর অর্থ কি এ বার দুর্বল শীত? আপাতত সেই আশঙ্কাই করা হচ্ছে। তবে ‘ভারতে শীত পড়বেই না’—এমন কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও নেই। কারণ, ভারতের শীতের ভাগ্য একা এল নিনিও নির্ধারণ করে না, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে ভারত মহাসাগরেরও। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভারত মহাসাগরে ‘পজ়িটিভ আইওডি’ তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত মহাসাগরের পশ্চিম অংশ পূর্ব অংশের তুলনায় বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। অনুকূল পরিস্থিতিতে এর প্রভাবে এল নিনিওর কিছু প্রতিকূল প্রভাব প্রশমিত হতে পারে। তাই শীত নিয়ে এখনই চূড়ান্ত হতাশার কারণ নেই।
সাম্প্রতিক নজির অবশ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৩-২৪–এর এল নিনিও পর্বে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত উষ্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ উষ্ণতম বছর হয়ে ওঠে। এ বারও শক্তিশালী এল নিনিও ইতিমধ্যে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার উপরে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তার জেরে তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা।
অতএব, উলের পোশাক বার করতে হবে না—এমন নিশ্চিত বার্তা দেওয়া না গেলেও ‘গডজ়িলা’ এল নিনিও ভারতের শীতের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা থাকছেই। কিন্তু দেশের সর্বত্র তার প্রভাব এক রকম হবে না। কোথাও শীতের দাপট কমতে পারে, কোথাও আবার অন্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতি সেই ছবিতে বদল আনতে পারে। দেশের কোন প্রান্তে কতটা শীত পড়বে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পেতে মৌসম ভবনের পরবর্তী ঋতুভিত্তিক পূর্বাভাসের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে।
