একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই বৈচিত্র্যের প্রতিটি ধারায় রাষ্ট্র সমান গুরুত্ব ও সুযোগ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত শিক্ষাধারা। লাখো শিক্ষার্থী দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে পড়াশোনা করছে। অথচ এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে সরকারি আলিয়া মাদরাসার সংখ্যা মাত্র তিনটি। সংখ্যাটি শুধু কম নয়, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাবাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করলে এটি গভীরভাবে ভাবার মতো একটি বিষয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই দেশের আট বিভাগে আলিয়া মাদরাসা জাতীয়করণের উদ্যোগের খবর সামনে এসেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বা জাতীয়করণের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভায় প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক খবর। জাতীয়করণের মতো বড় একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, আর্থিক সক্ষমতা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তৃতি বিশাল। সর্বশেষ প্রকাশিত শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি, সরকারি কলেজ ৭০৮টি এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৬৯৪টি। এর বিপরীতে সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাত্র তিনটি।
অন্যদিকে, দেশে এমপিওভুক্ত মাদরাসার সংখ্যা ৮ হাজার ২২৯টি। এর মধ্যে দাখিল ৫ হাজার ৭৬৭টি, আলিম ১ হাজার ২৮৫, ফাজিল ৯৯৩ এবং কামিল ১৮৪টি প্রতিষ্ঠান। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার সংখ্যাও ১ হাজার ২৫৮টি।
এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনেÑযে শিক্ষাধারায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই ধারায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এত সীমিত কেন?
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি স্কুল-কলেজের সুযোগ থাকলেও সরকারি আলিয়া মাদরাসার সুযোগ না থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প কী? বিশেষ করে সাধারণ আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কম খরচে মানসম্মত ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আলিয়া মাদরাসা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো সাম্প্রতিক সংযোজন নয়। এর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভিত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য। ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠানটি কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৬১ সালে বকশীবাজারে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি—এটাই বর্তমান বাস্তবতার একটি বড় অসামঞ্জস্য।
মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে সমাজে একটি পুরোনো ধারণা রয়েছে—এখানে পড়াশোনা করলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ মূলত ধর্মীয় ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বর্তমান বাস্তবতা এই ধারণাকে অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জ করেছে। আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করছে। উচ্চশিক্ষায়ও তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। মাদরাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হচ্ছে।
অর্থাৎ, আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে নয়; বরং তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের শিক্ষার সুযোগ, মান এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কোনো মাদরাসাকে জাতীয়করণ করলেই শিক্ষার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। জাতীয়করণের সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ও প্রযুক্তিসুবিধা, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আবাসিক সুবিধা, খেলাধুলার সুযোগ এবং আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির ব্যবহার। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশেষ করে কামিল পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ আরো বিস্তৃত করা দরকার। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, গবেষণার দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
দেশের আট বিভাগে অন্তত একটি করে মানসম্মত সরকারি আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত একটি সূচনা হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট মানদণ্ডে।
শুধু প্রতিষ্ঠানের বয়স বা স্থানীয় প্রভাব বিবেচনা না করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার পরিবেশ, ফল এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে জাতীয়করণের পরও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার এবং শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।
আলিয়া মাদরাসা জাতীয়করণ নিয়ে আলোচনাকে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিতÑযোগ্যতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। একজন শিক্ষার্থী কোন শিক্ষাধারায় পড়ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে কী ধরনের শিক্ষা পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করছে।
সুতরাং, সরকারি স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি আলিয়া মাদরাসার বিস্তৃতি ঘটানো হলে সেটিকে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের একটি অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হয়, তাহলে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আলিয়া মাদরাসা জাতীয়করণ কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাব্য পথ। তবে সেই পথ হতে হবে মানসম্মত, স্বচ্ছ, পরিকল্পিত ও টেকসই। রাষ্ট্র যদি প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীর জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে আলিয়া মাদরাসার ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তিনটি সরকারি আলিয়া মাদরাসা দিয়ে একটি বিশাল শিক্ষাধারার চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। সময়ের দাবি তাই স্পষ্ট—সরকারি আলিয়া মাদরাসার সংখ্যা বাড়াতে হবে।
লেখক : প্রভাষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ
